‘একবার ফোন করো…’—নেপালের হড়পাবানের পর থমকে অপেক্ষা, নিখোঁজ পর্যটকদের ফেরার আশায় পরিজনদের প্রহর গোনা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 20 h ago
‘একবার ফোন করো…’—নেপালের হড়পাবানের পর থমকে অপেক্ষা, নিখোঁজ পর্যটকদের ফেরার আশায় পরিজনদের প্রহর গোনা
‘একবার ফোন করো…’—নেপালের হড়পাবানের পর থমকে অপেক্ষা, নিখোঁজ পর্যটকদের ফেরার আশায় পরিজনদের প্রহর গোনা
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী, হুগলি:
 
ফোনটা কখন বেজে উঠবে? ওপার থেকে ভেসে আসবে কি সেই চেনা গলা—‘আমরা ভালো আছি’? এই একটিমাত্র আশাতেই এখন দিন-রাত পার করছেন নেপালে নিখোঁজ পর্যটকদের পরিজনেরা। নেপালের ভয়াবহ হড়পাবানের পর একের পর এক বাঙালি পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কেউ মঙ্গলবার রাতে শেষবার কথা বলেছেন বাড়ির লোকের সঙ্গে, কেউ আবার যাত্রাপথে পাঠিয়েছেন শেষ বার্তা। তারপর থেকেই শুধু অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন কাটছে বুকের ভিতর অজানা আশঙ্কা নিয়ে।

হুগলির উত্তরপাড়ার পানপাড়ার বাসিন্দা বিশ্বাস দম্পতি—ক্ষিতীশচন্দ্র বিশ্বাস (৬১) ও মমতা বিশ্বাস (৫৯)। ১৭ বছর আগে বাস দুর্ঘটনায় তাঁদের একমাত্র মেয়ে, স্কুলপড়ুয়া দিপালীকে হারিয়েছিলেন তাঁরা। সেই শোকের ক্ষত আজও শুকোয়নি। মেয়েকে হারানোর পর থেকেই তীর্থযাত্রায় মন দিয়েছিলেন দম্পতি। এক তীর্থ থেকে অন্য তীর্থে ঘুরে বেড়ানোই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁদের জীবনের অবলম্বন। এবার কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে কৈলাসের পথে বেরিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু নেপালে হড়পাবানের পর থেকেই তাঁদের কোনও খোঁজ নেই।

বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ পাড়ায় এসে নিখোঁজ হওয়ার খবর জানাতেই বিশ্বাস পরিবারের আকাশ ভেঙে পড়ে। যে বাবা-মা এত বছর আগে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বয়ে চলেছেন, তাঁদের কাছে ফের কোনও প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা যেন আরও এক দুঃস্বপ্ন। বাড়ির ফোনের দিকে তাকিয়ে এখন শুধু অপেক্ষা—কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন।

একই পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে যাত্রা করেছিলেন তারকেশ্বরের চাঁদপুরীর স্নেহাশিস দত্ত (৬০) এবং গেস্ট হাউস এলাকার বাসিন্দা জয়ন্ত সান্যাল (৪৫)-ও। তাঁদের সঙ্গেও এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জয়ন্ত ওই দলের ট্যুর ম্যানেজার ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। পর্যটন সংস্থার আরও এক কর্মী নৃপেন সরকার (২৬)-এরও কোনও সন্ধান নেই।

চন্দননগরের হরিদ্রাডাঙার বাসিন্দা শিপ্রা রায় (৬০)-এরও কোনও খোঁজ মিলছে না। আত্মীয়স্বজন থেকে প্রতিবেশী—সকলেই উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে, পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী স্বপন কুমার সিংহ (৬২)-এর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ আরও গভীর। গত বছর একাই মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন তিনি। ভিসা না পাওয়ায় সেই যাত্রা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। এবার ফের একাই রওনা হয়েছিলেন। মঙ্গলবার রাতে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষবার কথা হয়েছিল। তারপর থেকেই ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না তাঁকে। স্বপনের নিখোঁজ ডায়েরি করেছেন তাঁর স্ত্রী সোনালী সিংহ। তাঁর কথায়, ‘‘মঙ্গলবার রাতে কথা হয়েছিল। তারপর থেকে আর ফোনে পাচ্ছি না।’’

কথাগুলি যতটা সংক্ষিপ্ত, তার ভিতরের উৎকণ্ঠা ততটাই গভীর। প্রিয় মানুষটি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা যেন প্রতিটি পরিবারের ঘরে ঘরে।

নেপালে নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকায় রয়েছেন—অনির্বাণ ভট্টাচার্য (৬৭), অনিতা দাস (৬৮), দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় (৬২), সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় (৫৯), দিপালী সরকার (৬৫), সুভাষচন্দ্র ঘোষ (৬১), লোপামুদ্রা কুণ্ডু (৪৪), শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায় (৪৩), অমর নাথ পাল (৬১), ক্ষিতীশচন্দ্র বিশ্বাস (৬১), মমতা বিশ্বাস (৫৯), শিপ্রা রায় (৬০), শুভশ্রী চক্রবর্তী (৪৩), রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় (৫৪), নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস (৬৬), শিখা নস্কর বিশ্বাস (৬০), কেয়া প্রামাণিক (৫৮), অরিন্দম গাঙ্গুলি (৬১), মৌসুমী গাঙ্গুলি (৫৩), মিতালী মণ্ডল (৪৭), দেবব্রত রায় চৌধুরী (৬৭), লেখা রায় চৌধুরী (৬২), স্বপন কুমার সিংহ (৬২), মঞ্জু রায় চৌধুরী (৬৬), রঞ্জিত কুমার হাওলাদার (৬৩), স্বপন মণ্ডল (৬৭), মউ মণ্ডল (৬১), সুস্মিতা ভট্টাচার্য (৬৬) এবং স্নেহাশিস দত্ত (৬০)। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন পর্যটন সংস্থার কর্মী জয়ন্ত সান্যাল (৪৫) ও নৃপেন সরকার (২৬)।

তালিকাটি এখন শুধু কয়েকটি নামের সমষ্টি নয়। প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি করে পরিবার, অসংখ্য স্মৃতি, অপেক্ষা আর প্রার্থনা। তাই পরিজনদের একটাই প্রার্থনা—নেপালের দুর্গম পথ পেরিয়ে, বিপদ কাটিয়ে, প্রিয় মানুষগুলি যেন আবার ফোন করেন। আবার শোনা যায় সেই চেনা কণ্ঠস্বর—‘চিন্তা কোরো না, আমরা ফিরে আসছি।’


শেহতীয়া খবৰ