নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নতুন বিপদ, ২০ লাখ ঘনমিটার পানিতে তৈরি ‘ব্যারিয়ার লেক’—বাঁধ ভাঙলে ফের হড়পা বানের আশঙ্কা
নেপালঃ
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এবার নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি ধসে দুটি নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল একটি প্রাকৃতিক হ্রদ বা ‘ব্যারিয়ার লেক’। ইতিমধ্যেই হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার জল জমেছে। চীনা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার জল জমতে পারে। প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ জল, পাথর ও পলি একসঙ্গে ভাটির দিকে নেমে ফের ভয়াবহ হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের জল সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে। সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় জরুরি উদ্ধার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
নেপালের ছোছেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে ভূমিধসের জেরে নতুন এই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। দুটি নদীরই উৎপত্তি তিব্বতে। নেপালে প্রবেশের আগে তারা মিলিত হয়ে ভোটেকোশী নদী নামে প্রবাহিত হয়। পরে এই নদী ত্রিশূলী নদীর গুরুত্বপূর্ণ উপনদীতে পরিণত হয়েছে।
হ্রদে জলের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মাটি ও পাথরের তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর চাপ। বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিলিয়ন ঘনমিটার জল মুহূর্তের মধ্যে নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। এর সঙ্গে মাটি, পাথর ও পলি মিশে গেলে নদীর গতিপথের জনপদ, সড়ক, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে বুধবার নেপালের রাসুওয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসি এলাকায় প্রবল জলস্রোতে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বহু পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে সেই জলস্রোত ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে যায়।
এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপাল সরকারের হিসাবে, বুধবারের বিপর্যয়ে ৩৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৭০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক বলে জানা গেছে। তিব্বতের দিকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে ২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু এবং অন্তত ৫৫৮ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রায় ২০০ ভারতীয় তীর্থযাত্রী ও পর্যটক তিব্বতে আটকা পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
দুর্যোগের কারণ নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশ্লেষণ চলছে। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, তুষারধস বা ভূমিধসের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে বিপুল পানি জমে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে যাওয়ার কারণেই প্রবল জলস্রোত নেমে আসে। হিমবাহের বরফ গলে তৈরি কোনো জলাধার ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটি এখন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জলের স্তর ও প্রবাহের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য বাঁধ ভাঙার ঝুঁকি মোকাবিলায় বন্যার পূর্বাভাস ও জলস্তর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে এর প্রভাব শুধু নেপাল ও তিব্বতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ভাটির নদীপথ ধরে প্রবল জলস্রোত নেমে এলে ভারতের বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কিছু এলাকাতেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে উদ্ধার ও ত্রাণের পাশাপাশি নতুন তৈরি হওয়া ‘ব্যারিয়ার লেক’-এর ওপর নজর রাখাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।