চন্ডীতলার মাটিতে ফের আস্থার জয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বে বড় জয় স্বাতী খন্দকারের
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ যখন তৃণমূল কংগ্রেসের গড়ে একের পর এক ধ্বস নেমে চলেছে সে সময় পতপত করে উড়ছিল চন্ডীতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের গড়ের পতাকা। প্রার্থী স্বাতী খন্দকার। চন্ডীতলা কেন্দ্র আবারও প্রমাণ করল গেরুয়া ঝড়ে ভেসে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই নেতৃত্বকেই বেছে নেয়, যিনি বিভেদের নয়, সমন্বয়ের বার্তা বহন করেন। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী স্বাতী খন্দকারের জয় শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, সর্বধর্ম সমন্বয় এবং দীর্ঘদিনের জনবিশ্বাসেরও এক বড় স্বীকৃতি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাতী খন্দকার ১,০৭,১৪৩ ভোট পেয়ে বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস মুখার্জিকে ১৯,৬৬৩ ভোটে পরাজিত করেছেন। দেবাশিস মুখার্জি পেয়েছেন ৮৭,৪৮০ ভোট। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চন্ডীতলার মানুষের আস্থা আজও সেই নেতৃত্বের উপর, যারা মানুষের পাশে থাকে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে।স্বাতী খন্দকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবনও চন্ডীতলার মানুষের কাছে এক অনন্য বার্তা বহন করে। বিবাহের আগে তিনি ছিলেন স্বাতী চট্টোপাধ্যায়—এক হিন্দু পরিবারে বেড়ে ওঠা নারী।
বিবাহিত জীবনে খন্দকার পরিবারে এসে তিনি শুধু পারিবারিক সম্পর্কই গড়ে তোলেননি, বরং হিন্দু ও মুসলিম—দুই ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অসাধারণ সমন্বয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর জীবনযাপন, সামাজিক উপস্থিতি এবং জনসংযোগে বারবার উঠে এসেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির সেই বাস্তব ছবি, যা আজকের সময়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।চন্ডীতলায় এমন কোনও বড় উৎসব, পূজা, পার্বণ বা সামাজিক অনুষ্ঠান প্রায় নেই যেখানে স্বাতী খন্দকারের উপস্থিতি দেখা যায় না। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা থেকে শুরু করে স্থানীয় হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। একইভাবে ঈদ, মিলাদ, রমজান বা মুসলিম সমাজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাঁকে সমান আন্তরিকতায় দেখা যায়। এই ধারাবাহিক উপস্থিতি তাঁকে শুধু একজন জনপ্রতিনিধি নয়, বরং ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সামাজিক ঐক্যের মুখ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, স্বাতী খন্দকারের এই গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম বড় কারণ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনদর্শন—যেখানে ধর্ম পরিচয়ের চেয়ে বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক। তিনি নিজের পারিবারিক জীবনেও যেমন দুই সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তেমনি রাজনৈতিক জীবনেও চন্ডীতলায় সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিয়েছেন—সব ধর্ম, সব সম্প্রদায়, সব মানুষের জন্য সমান সম্মান।
স্বাতী খন্দকার ও তাঁর স্বামী খন্দকার পরিবার তৃণমূল কংগ্রেসের একেবারে প্রাথমিক সময় থেকেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ঘাসফুলের শুরুর দিনের লড়াই থেকে আজকের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন—প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলেই স্থানীয় স্তরে তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দৃঢ় হয়েছে। দলের দুঃসময়ে যেমন তাঁরা পাশে থেকেছেন, তেমনি সুসময়েও সংগঠনকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যেতে কাজ করেছেন।
চন্ডীতলার মানুষ তাই শুধু একজন প্রার্থীকে ভোট দেননি; তাঁরা বেছে নিয়েছেন এমন এক মুখকে, যিনি তাঁদের সামাজিক পরিসরেরই অংশ, যিনি পূজার মণ্ডপেও যেমন পরিচিত, তেমনি ঈদের শুভেচ্ছাতেও সমান আপন। এই কারণেই স্বাতী খন্দকার আজ ধর্মীয় সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন।চন্ডীতলার এই রায় আরও একবার বুঝিয়ে দিল—মানুষ বিভাজনের রাজনীতি নয়, বিশ্বাস, সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির পথকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। আর সেই পথের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন স্বাতী চট্টোপাধ্যায় থেকে স্বাতী খন্দকার—একজন নারী, যিনি ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক জীবন—দুই ক্ষেত্রেই ধর্মীয় সমন্বয়কে শক্তিতে পরিণত করেছেন।