তরুণ নন্দী / উঃ ২৪ পরগনাঃ
১৯৯৯ সালের অপারেশন বিজয়, ২০০১ সালের অপারেশন পরাক্রম এবং ২০২৫ এর অপারেশন সিঁদুরে অংশ নেওয়া বীর জওয়ানের নাম নেই ভোটার লিস্টে। দেশের রক্ষার জন্য জীবনের ৩০টি বসন্ত কাটিয়েও এখনও নাগরিক হতে না পারার আপেক্ষ রয়েছে তাঁর। ১৯৯৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর 'কর্পস অফ ইলেকট্রনিক অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স'-এ যোগদান করেছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার (North 24 parganas) বাদুড়িয়া ব্লকের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা আজাদ আলি। গত অক্টোবরে সুবেদার মেজর পদমর্যাদা নিয়ে সসম্মানে অবসর নিয়েছেন ভারতমাতার এই বীর সৈনিক (Indian Army)। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দীর্ঘ তিন দশক ধরে শত্রুপক্ষের দিকে চোখে চোখ রেখে সীমান্ত পাহারা দিয়ে ঘরে ফেরার পর আজ নিজের নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে লড়তে হচ্ছে তাঁকে।
সামনে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬র নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় (SIR) বীরসেনা আজাদ আলির নাম বর্তমানে বাতিলের তালিকায় রাখা হয়েছে। যা নিয়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। ভারতের হয়ে লড়াই করা এই জওয়ান ২০২৫-এর 'অপারেশন সিঁদুর'(Operation Sindoor)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন জুনিয়র কমিশনড অফিসার হিসেবে। সেই মানুষটার নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী থেকে শাসক শিবির (Voter list deletion protest)।
ভোটার তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন আজাদ আলি। তিনি জানান, ৩০ বছর দেশসেবা করেছি। জম্মু-কাশ্মীর থেকে অরুণাচলের চিন সীমান্ত, দেশের টানে যেখানে পোস্টিং হয়েছে সেখানেই নৈতিক কর্তব্য পালন করেছি। গত ১৫ নভেম্বর নির্দিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার দেবস্মিতা পাল বিশ্বাসের কাছে সমস্ত নথিসহ এনামিউলেশন ফর্ম জমা দিয়েছিলাম। তার পরেও আমার নাম বিচারাধীন তালিকায় দেখে মনটা খারপ হয়ে যায়। তারপর বাতিল হয়ে গেল। মনের আক্ষেপ থেকে তিনি প্রশ্ন তুললেন, যাঁরা জীবন বাজি রেখে দেশের সেবা করতে সীমান্তে থাকেন তাদের জন্য নির্বাচন কমিশনের কি আরও সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল না?
প্রাক্তন সেনাকর্তার এই অবস্থার কথা জানাজানি হতেই পাশে দাঁড়িয়েছেন রামচন্দ্রপুরের স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী তরিকুল ইসলামের কথায়, সুবেদার সাহেব অত্যন্ত সজ্জন বিচক্ষণ মানুষ। তাঁর বাবা ও আমাদের বাবারা একসঙ্গে মিলেমিশে যেতেন ভোট দিতে। বছরের পর বছর ধরে ভোট দেওয়ার পর তাঁর নাম কেন বাদ যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আমাদের মনেও। দেখা গেল, এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে ব্যাখা করেছে। তাঁদের মতে, সেনার সাফল্য নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের আমলেই সেনাকর্মীরা ভোটাধিকার হারাচ্ছেন।
আজাদ আলি তাঁর সহকর্মী জওয়ানদের সঙ্গে
এই জওয়ানের পরিবারের আক্ষেপ দেখা গেল আরও তীব্র। আজাদ আলির কন্যা সিমরান আলির প্রশ্ন, আমার বাবা জীবনের মূল্যবান সময়টাতে দেশের জন্য লড়াই করলেন। পরিবারের ১৫ জন সদস্যের নাম তালিকায় থাকলেও বাবার নামটাই ডিলিট হয়ে গেল কি করে? বাবার যদি নাগরিকত্ব না থাকে, তবে কার থাকবে? ভারতীয় সেনার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া কি নিছকই যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ? উত্তরটা খুঁজে চলেছে বাদুরিয়ার বাসিন্দারা।