ক্যারিয়ারের তাগিদে একসময় অসম ছাড়তে বাধ্য, আজ নিজের মাটিতে ফিরলেন 'ব্যাকস্ট্রোক কুইন' ফারিহা জামান

Story by  Imtiaz Ahmed | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
ফারিহা জামান
ফারিহা জামান
 
ইমতিয়াজ আহমেদ / গুয়াহাটি

দীর্ঘদিন ধরেই জলক্রীড়ার মানচিত্রে অসম এক উজ্জ্বল নাম হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। এলভিস আলি হাজারিকা ও মিঠু বরুয়ার মতো কৃতী সাঁতারুদের হাত ধরেই এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সূচনা। সেই ধারাবাহিকতায় অসম বারবার উপহার দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভা, যারা নিজেদের কৃতিত্বে দেশকে গর্বিত করেছে।
 
কিন্তু ২১শ শতকের প্রথম দশকে এমন এক কঠিন সময়ও এসেছিল, যখন এক প্রতিভাবান কিশোরী জাতীয় প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে থেকেও অংশগ্রহণের অনুমতি পাননি। কারণ? অসমে তখন দুটি সমান্তরাল সাঁতার সংস্থা ছিল, সংগঠকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে তৈরি এই জটিলতা। আর এই অন্যায়ের শিকার হয়েছিলেন সেই তরুণী, ফারিহা জামান। একবার নয়, একাধিকবার এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। অথচ পরবর্তীতে তিনিই হয়ে ওঠেন ভারতের ‘ব্যাকস্ট্রোক কুইন’ (Backstroke Queen of India), যার ঝুলিতে এখনও রয়েছে সাতটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড।
 
ফারিহা জামান
 
জন্ম থেকেই যেন জলের সঙ্গে তাঁর এক গভীর সম্পর্ক। এক-দু’ বছর বয়স থেকেই জলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি গুয়াহাটির ঐতিহাসিক দিঘলিপুখুরীতে প্রথম সাঁতার কাটেন, যে জলাশয় বহু কিংবদন্তি সাঁতারুর জন্ম দিয়েছে। এরপর তিনি যোগ দেন আরজি বরুয়া স্পোর্টস কমপ্লেক্সের বি.পি. চালিহা সুইমিং পুলে। সেখানে তাঁর প্রতিভা প্রথম নজরে আসে কোচদের। তাঁকে দ্রুত উন্নত প্রশিক্ষণে নেওয়া হয় এবং স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার কোচ রবীন্দ্র মোদকের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তাঁর পেশাদার যাত্রা। মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি জাতীয় স্কুল গেমসে আত্মপ্রকাশ করেন।
 
তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। নিজের কথায়, “আমি যখন অন্যদের তুলনায় ভালো পারফর্ম করতে শুরু করি, তখন থেকেই কিছু মানুষ আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করে। আমার মাকে পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হয়েছিল আমাকে মেরে ফেলার। তাদের সন্তানদের পারফরম্যান্সের ওপর আমার প্রভাব পড়ছিল বলেই তারা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিল। একসময় আমি এতটাই ভয় পেয়ে যাই যে সুইমিং পুলে যেতেই ভয় লাগত।” শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার জন্য তাঁদের পুনেতে চলে যেতে হয়।
 
অসম ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের সুইমিং কনসালটেন্ট হিসেবে ফারিহা জামান
 
ফারিহার মা সালিমা জামান তাঁর সাফল্যের পেছনে এক বিশাল শক্তি। মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি নিজের জীবনকেও বদলে ফেলেন, এমনকি বেঙ্গালুরুতেও স্থানান্তরিত হন শুধুমাত্র মেয়ের কেরিয়ারের জন্য। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল সেই “অযোগ্য ঘোষণা”-র মুহূর্ত। ফারিহা বলেন, “প্রতিযোগিতার ঠিক আগে ব্লকে দাঁড়িয়ে আমাকে জানানো হয় আমি অংশ নিতে পারব না, কারণ অসমে দুটি আলাদা সংস্থা রয়েছে। এমনটা একাধিকবার হয়েছে। একজন সাঁতারু হিসেবে আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিই। এই ধরনের অযোগ্য ঘোষণায় মনে হয় আমার প্রাপ্য পদক অন্য কেউ পাচ্ছে, যে তা পাওয়ার যোগ্য নয়।”
 
এই পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে অসম ছাড়তে বাধ্য করে। কমনওয়েলথ গেমসের নির্বাচনী ট্রায়ালের জন্য তিনি কর্ণাটক রাজ্যের হয়ে নাম লেখান। কর্ণাটকের হয়ে খেলতে গিয়েই তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রবেশ করেন এবং নয়টি পদক জেতেন। জাতীয় পর্যায়ে অভিষেকের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ৫০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে ১২ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দেন, যা এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
 
ফারিহা জামান সুইমিং পুলে
 
তবুও তাঁর সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ২০০৭ সালে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ৩৩তম ন্যাশনাল গেমসে অসমের হয়ে জেতা ব্যাকস্ট্রোক স্বর্ণপদক। তিনি বলেন, “সেই দিন পুরো স্টেডিয়াম ভরে গিয়েছিল অসমের মানুষের উল্লাসে। এখনও সেই মুহূর্ত মনে পড়লে শরীরে কাঁটা দেয়। মনে হয়, আমি যেন তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছিলাম।” চাপ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি মানসিকভাবে একটু আলাদা। আমি কখনও চাপ নিইনি। আমি শুধু আমার প্রস্তুতি আর লক্ষ্য, পদকের দিকে মনোযোগ দিতাম। প্রতিযোগিতা আমার কাছে ছিল পরীক্ষার মতো।”
 
সাঁতারের ক্যারিয়ার শেষে তিনি দুবাইয়ে চলে যান এবং কোচ হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। এখন তিনি আবার অসমে ফিরে এসেছেন, নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে। অসম সরকার তাঁকে স্পোর্টস অথরিটি অফ অসমের অধীনে সাঁতার কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন অত্যাধুনিক টাচ প্যাড, ব্যবহার করে তিনি নতুন প্রতিভা গড়ে তুলছেন।
 
ফারিহা জামান গুয়াহাটির ড. জাকির হুসেন অ্যাকোয়াটিক্স কমপ্লেক্সে 

ফারিহা বলেন, “আজকের দিনে সাঁতারুরা অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক সহায়তা পাচ্ছে। অসম একটি প্রাকৃতিকভাবে সাঁতারের জন্য উপযুক্ত অঞ্চল। তাই এখনকার প্রজন্মের লক্ষ্য হওয়া উচিত অলিম্পিক।” নিজে অলিম্পিকে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই অনেক কিছু অর্জন করেছি, কোনো সাপ্লিমেন্ট ছাড়াই। তবে এখন মনে হয়, যদি মানসিক কাউন্সেলিং পেতাম, তাহলে হয়তো অলিম্পিকে যেতে পারতাম।”
 
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, খুব শীঘ্রই তিনি একটি ‘স্প্ল্যাশ পুল’ (Splash Pool) শুরু করতে চলেছেন, যেখানে দুই বছর বয়স থেকে শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, এমনকি যারা জলভীতি রয়েছে তাদেরও। তাঁর লক্ষ্য একটাই, অসম থেকে অলিম্পিয়ান তৈরি করা।
 

উল্লেখ্য, এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অসম এখনও পর্যন্ত কোনো অলিম্পিক সাঁতারু তৈরি করতে পারেনি। তবে ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, তীরন্দাজি এবং ফুটবলে রাজ্যটি ইতিমধ্যেই অলিম্পিয়ান উপহার দিয়েছে।