সুদীপ শর্মা চৌধুরী / গুয়াহাটি
শুরুর অধ্যায়: এক ব্রিটিশ মাঠ থেকে জাতীয় গৌরবের পথে
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান হকি ফেডারেশন (IHF)। সেই বছরই ভারতের হকি দল প্রথমবার আন্তর্জাতিক সফরে যায় নিউজিল্যান্ডে। তিন বছরের মধ্যেই ১৯২৮ সালের অ্যামস্টারডাম অলিম্পিকে ভারতীয় দল অংশগ্রহণ করে- আর সেখানেই শুরু হয় এক অনন্য ইতিহাস।
ক্যাপ্টেন জে. এফ. ব্লেক-এর নেতৃত্বে এবং মেজর ধ্যানচাঁদ-এর জাদুকরী স্টিকের স্পর্শে ভারত জেতে তার প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণপদক। সেই মুহূর্ত থেকেই বিশ্ব জানল- হকির আরেক নাম ভারত।
১৯৩৬ সালে বার্লিনে ভারতের হকি দল, স্বর্ণপদক বিজয়ী ধ্যান চাঁদের নেতৃত্বে (বাম দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে)
স্বর্ণযুগ: ধ্যানচাঁদ থেকে বালবীর সিং পর্যন্ত এক অপরাজেয় অধ্যায়
১৯২৮ থেকে ১৯৫৬, এই সময়টিই ভারতীয় হকির “গোল্ডেন ইরা” নামে পরিচিত। ভারত টানা ছয়টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতে গড়ে তুলেছিল বিশ্বরেকর্ড। মেজর ধ্যানচাঁদ, বালবীর সিং সিনিয়র, লেসলি ক্লডিয়াস, কুনওয়ার দিগ্বিজয় সিং, উদ্ধাম সিং, এঁরা শুধু খেলোয়াড় নন, ছিলেন এক একটি কিংবদন্তি। তাঁদের কৃতিত্বে ভারতের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্ব হকির প্রতিটি মঞ্চে। হকি হয়ে উঠেছিল জাতীয় গর্ব, দেশের পরিচয়ের প্রতীক।
চ্যালেঞ্জের দশক: অ্যাস্ট্রো টার্ফ ও নতুন যুগের পরীক্ষা
১৯৭০-এর দশকে হকির মাঠে এল বড় পরিবর্তন, প্রাকৃতিক ঘাসের বদলে অ্যাস্ট্রো টার্ফ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় ভারত কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার দলগুলো প্রযুক্তি ও গতি-নির্ভর খেলার দাপটে এগিয়ে যায়। তবুও ভারত থামেনি। ধীরে ধীরে শুরু হয় পুনর্গঠন। ৯০-এর দশকে ভারতীয় হকি আবারও প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে, নতুন প্রজন্ম, নতুন কোচিং পদ্ধতি ও নতুন মানসিকতা নিয়ে।
১৯৭৬- এ আর্টিফিশিয়াল গ্রাসের ফিল্ডে অলিম্পিক টুর্নামেন্টে হল্যান্ডের সঙ্গে ভারতীয় দল
নবজাগরণ: টোকিও অলিম্পিকে নতুন সূর্যোদয়
২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিক ভারতীয় হকির ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয়। পুরুষ দল দীর্ঘ ৪১ বছর পর ব্রোঞ্জ জিতে ফিরেছিল গর্বের সঙ্গে। অন্যদিকে ভারতীয় নারী হকি দল প্রথমবারের মতো অলিম্পিক সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস গড়ে। এই দুই সাফল্য যেন জানিয়ে দিল, ভারতীয় হকি আবার ফিরছে নিজের জায়গায়।
শতবর্ষে নতুন প্রতিশ্রুতি: “হকি ফর অল” আন্দোলন
ভারতীয় হকি ফেডারেশন শতবর্ষ উপলক্ষে ঘোষণা করেছে বেশ কিছু দূরদর্শী উদ্যোগ:
* দেশজুড়ে হকি একাডেমি ও ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন
* গ্রামীণ অঞ্চলে হকির প্রসার ঘটাতে “হকি ফর অল” কর্মসূচি
* মহিলা হকির উন্নয়নে বিশেষ তহবিল ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প
প্রতীকী ছবি
২০২৫ সালে দেশব্যাপী “হকি শতবর্ষ ট্রফি” প্রতিযোগিতা আয়োজন। এই কর্মসূচিগুলি শুধু ক্রীড়াক্ষেত্র নয়, সামাজিক সংহতি ও যুব প্রেরণার প্রতীক হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
একশো বছরের গৌরব, সামনে আরও অনেক পথ। ভারতীয় হকি শুধু একটি খেলা নয়, এটি এক জাতীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়। ধানচাঁদের স্টিক থেকে রানি রামপালের আত্মবিশ্বাস, মনপ্রীত সিংয়ের নেতৃত্ব থেকে তরুণ খেলোয়াড়দের উদ্দীপনা, সব মিলিয়ে ভারতীয় হকি আবারও এক নতুন ইতিহাস রচনার পথে। একশো বছর পূর্তি তাই শুধু উদযাপন নয়, এটি “স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার আহ্বান”।