মালিক আসগর হাশমি / ফরিদাবাদ (হরিয়ানা)
আজ যখন ভারতীয় শুটিং বিশ্বজুড়ে নিজের দাপট দেখাচ্ছে, এবং মনু ভাকের থেকে অভিনব বিন্দ্রা, এই নামগুলো সবার মুখে মুখে ঘুরছে, তখন এক নাম নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রীড়া জগতের আলোচনায়। সেই নামটি হল আনিসা সৈয়দ। একসময় যার গুলিতে ঝরে পড়ত দেশের জন্য পদকের বৃষ্টি, আজ তিনি ফরিদাবাদে নিজের সংসারে ব্যস্ত, বড় করে তুলছেন তাঁর নয় বছরের মেয়েকে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি সেই ক্রীড়াবিদ, যিনি প্রতিকূলতাকেই নিজের “টার্গেট” বানিয়ে সরাসরি আঘাত করেছিলেন এবং দেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন সাত সমুদ্র পেরিয়ে।
আনিসা সৈয়দের আন্তর্জাতিক শুটার হয়ে ওঠার গল্প যেন এক রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। আজকের দিনে যেখানে আধুনিক শুটিং রেঞ্জ ও প্রশিক্ষকের অভাব নেই, সেখানে আনিসা তৈরি করেছিলেন নিজের পথ চরম অভাবের মধ্যে দিয়ে। এক কথোপকথনে তিনি জানিয়েছিলেন, শুরুর দিনে বাইরে গিয়ে অনুশীলনের সুযোগ ছিল খুবই কম। তাই নিজের বাড়ির দুই ঘরের মাঝে লক্ষ্য বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করতেন। এই দৃঢ়তা ও আবেগই তাঁকে একটি সাধারণ এয়ারগান থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেয়।
আনিসা সৈয়দ
১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার খাদকি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তিনি পেয়েছিলেন তাঁর বাবা আব্দুল হামিদ সৈয়দের কাছ থেকে, যিনি ক্লাব স্তরের ফুটবলার ছিলেন। কলেজ জীবনে এনসিসি (ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস)-এর প্রশিক্ষণের সময়ই তাঁর শুটিং যাত্রা শুরু হয়, এবং স্কুলে তিনি ‘সেরা এনসিসি শুটার’ খেতাব অর্জন করেন।
আনিসা সৈয়দের কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় আসে ২০১০ সালের দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসে। সেই বছর তিনি রাহী সারনোবাতের সঙ্গে ২৫ মিটার পিস্তল ইভেন্টে দলগত সোনা জেতেন, পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিভাগেও ৭৭৬.৫ স্কোর করে স্বর্ণপদক জিতে নতুন রেকর্ড গড়েন। তাঁর এই জয় তখন ভারতীয় ক্রীড়াজগতে নতুন আশার আলো জাগিয়েছিল।
তাঁর অন্যান্য সাফল্যগুলো হলঃ
* ২০০৬: দক্ষিণ এশীয় গেমসে (SAF) স্বর্ণপদক জিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন
* ২০১৪: গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে রৌপ্যপদক
* ২০১৪: ইনচন এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ পদক
* ২০১৭: ন্যাশনাল শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে (NSCC) স্বর্ণপদক এবং ২৫ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে নতুন জাতীয় রেকর্ড
আনিসা সৈয়দের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর ক্রীড়া জীবনের মতোই সাহসী। একটি আধুনিক মহারাষ্ট্রীয় পরিবারে বড় হওয়া আনিসা ভালোবেসে বিয়ে করেন মুবারক হুসেন খানকে, যিনি হরিয়ানার মেওয়াত (নুহ)-এর বাসিন্দা। রক্ষণশীল ও কঠোর সামাজিক পরিবেশের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে একজন ক্রীড়াবিদ পুত্রবধূ হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি স্মরণ করেন, প্রথমদিকে পারিবারিক নিয়ম-কানুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধা হয়েছিল। কিন্তু যেমন একজন শুটার লক্ষ্যভেদে মনোনিবেশ করে, তেমনই তিনি সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় মন দেন। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যায়। আজ তিনি ফরিদাবাদে স্বামী ও ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া মেয়েকে নিয়ে সুখী সংসার জীবন কাটাচ্ছেন। মাঠের সেই আগ্রাসী শুটার এখন সমান নিষ্ঠায় একজন স্নেহময়ী মা ও স্ত্রী।
আনিসা সৈয়দের গল্প শুধু সাফল্যের নয়, সিস্টেমের বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও গল্প। একসময় তিনি ভারতীয় রেলওয়েতে টিকিট কালেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু বারবার বদলির আবেদন নাকচ হওয়ায় তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়। আশ্চর্যের বিষয়, যে ক্রীড়াবিদ দেশের জন্য এত গৌরব বয়ে এনেছেন, তাকেই পরবর্তীতে চাকরি ও মৌলিক সুযোগের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে।
২০১৭ সালে তিনি ক্রীড়া দপ্তরের কিছু আধিকারিকের বিরুদ্ধে হয়রানি ও দুই বছরের বেতন না পাওয়ার অভিযোগও দায়ের করেন। এটি ভারতীয় বাস্তবতার এক বেদনাদায়ক চিত্র, পদকজয়ী ক্রীড়াবিদরাও অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার হন।
বর্তমানে আনিসা শুটিং থেকে কিছুটা দূরে সরে এসেছেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য এখন তাঁর নয় বছরের মেয়েকে বড় করে তোলা। তবুও ক্রীড়াপ্রেমীরা তাঁকে ভোলেনি। ভারতের মহিলা পিস্তল শুটারদের কথা উঠলেই তাঁর নাম অনুপ্রেরণা হিসেবে উঠে আসে।
তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকা উড়াতে পারে। আজ তিনি ফরিদাবাদের অলিতে-গলিতে নিজের ব্যক্তিগত জীবন কাটালেও, ক্রীড়া ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে সেই “অভ্রান্ত নিশানাবাজ” হিসেবে, যিনি ভারতীয় নারী শুটিংকে নতুন পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর জীবন আজকের প্রজন্মের মেয়েদের জন্য এক বড় শিক্ষা, লক্ষ্য যদি ঠিক থাকে, তবে তা খেলাধুলা হোক বা জীবন, একাগ্রতাই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি।