পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: সমীক্ষায় মমতা এগিয়ে, তবে বাড়ছে অসন্তোষের ইঙ্গিত

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 7 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘ভোট ভাইব ইনসাইটস’-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। ১৩ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনও এগিয়ে রয়েছেন  মমতা ব্যানার্জি। তবে একই সঙ্গে বেশ কিছু সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনাও স্পষ্ট হচ্ছে।
 
সমীক্ষায় রাজ্য সরকারের গত পাঁচ বছরের সামগ্রিক কাজের মূল্যায়নে ৩৪.৮ শতাংশ মানুষ “চমৎকার” এবং ৯.৫ শতাংশ “ভালো” বলেছেন। অর্থাৎ মোট ৪৪.৩ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। অন্যদিকে ১২.৯ শতাংশ “খারাপ” এবং ১৮.২ শতাংশ “অত্যন্ত খারাপ” বলেছেন—মোট নেতিবাচক মতামত ৩১.১ শতাংশ। ১৫ শতাংশ মানুষ সরকারকে “গড়পড়তা” বলেছেন এবং ৯.৬ শতাংশ মতামত দিতে পারেননি।
 
এই ফলাফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। মুসলিম ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি সবচেয়ে বেশি—৪৯ শতাংশ “চমৎকার” বলেছেন। বিপরীতে তফসিলি জাতি (SC) ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বেশি, যেখানে ৪৩ শতাংশ সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। বয়সের দিক থেকেও পার্থক্য দেখা গেছে। ৪৫-৫৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ সরকারের কাজকে ইতিবাচক বলেছেন, কিন্তু ১৮-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ ইতিবাচক মত দিয়েছেন। ফলে বিশ্লেষকদের মতে তৃণমূলের সমর্থনভিত্তি তুলনামূলকভাবে বয়স্ক এবং মুসলিম ভোটারদের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
 
পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান—এই প্রশ্নেও এগিয়ে রয়েছেন  মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি পেয়েছেন ৪১.৬ শতাংশ সমর্থন। বিজেপির পক্ষ থেকে  শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ১৮.৯ শতাংশ,  শমীক ভট্টাচার্য ১৫ শতাংশ এবং  দিলীপ ঘোষ ৩.৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। কংগ্রেস নেতা  অধীর রঞ্জন চৌধুরী পেয়েছেন ৪.২ শতাংশ এবং তৃণমূলের  অভিষেক ব্যানার্জি পেয়েছেন ৩.৭ শতাংশ। সিপিএম নেতা মোহাম্মদ সেলিম পেয়েছেন ৩.১ শতাংশ।
 
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। তৃণমূলের দুই মুখ—মমতা ও অভিষেক—মিলে মোট সমর্থন ৪৫.৩ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপির তিন নেতা—শুভেন্দু, শমীক ও দিলীপ—মিলে সমর্থন ৩৭.৬ শতাংশ। অর্থাৎ তৃণমূল এখনও এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুব বড় নয়। বিশেষ করে তফসিলি উপজাতি (ST) ভোটারদের মধ্যে সুবেন্দু অধিকারী ৩৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন ৩২ শতাংশ। তফসিলি জাতি ভোটারদের মধ্যেও লড়াই প্রায় সমানে—শুভেন্দু ২৯ শতাংশ এবং মমতা ২৭ শতাংশ।
 
সমীক্ষায় ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কী—এই প্রশ্নেও স্পষ্ট বার্তা এসেছে। ৩৬.৩ শতাংশ মানুষ বেকারত্বকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ও নারীর নিরাপত্তা (১৯.৪ শতাংশ)। বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতার আরজি কর হাসপাতাল-সংক্রান্ত ঘটনার মতো বিষয়গুলির প্রভাব এই উদ্বেগে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির প্রধান প্রচারের বিষয়—অবৈধ অনুপ্রবেশ, এসআইআর বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ—ভোটারদের অগ্রাধিকার তালিকায় অনেক নিচে রয়েছে।
 
তবে রাজনৈতিক বয়ানে বিজেপির কিছু দাবি জনমনে প্রভাব ফেলছে বলেও সমীক্ষায় দেখা গেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগকে ৪৭.১ শতাংশ মানুষ বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন। তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি, ওবিসি এবং সাধারণ শ্রেণির ভোটারদের মধ্যে ৫২ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত এই অভিযোগকে সত্য বলে মনে করছেন। এমনকি মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও ২৮ শতাংশ এটিকে আংশিক বা সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে করেন।
 
নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের বিশেষ কর্মসূচি—এসআইআর (Special Intensive Revision)—নিয়েও সমীক্ষায় বড় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ৩৭.৮ শতাংশ মনে করেন এটি অবৈধ ভোটারদের চিহ্নিত করার জন্য দরকারি। ২৮.৭ শতাংশ একে নিয়মিত তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ মোট ৬৬.৫ শতাংশ মানুষ এটিকে বৈধ বা স্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মাত্র ১১.১ শতাংশ মনে করেন এটি নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা। তফসিলি জাতি ভোটারদের মধ্যে এই পদক্ষেপের সমর্থন সবচেয়ে বেশি—৭৯ শতাংশ।
 
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান এবং আইপ্যাককে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারের লড়াইয়ে তৃণমূল কিছুটা এগিয়ে আছে। এই ইস্যুতে ৩৬.১ শতাংশ মানুষ তৃণমূলের বক্তব্যকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন, যেখানে বিজেপির পক্ষে মত দিয়েছেন ২০.৬ শতাংশ। তবে ২৬.৩ শতাংশ মানুষ “মতামত নেই” বলেছেন, যা থেকে বোঝা যায় এই বিষয়টি এখনও সাধারণ ভোটারের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
 
সব মিলিয়ে সমীক্ষার সারসংক্ষেপ বলছে—মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে তাঁর শক্ত অবস্থান বজায় রয়েছে। তবে তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি ভোটারদের মধ্যে ভাঙনের ইঙ্গিত, তরুণ ভোটারদের সংশয়, বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ এবং “মোদী-মমতা বোঝাপড়া” নিয়ে বাড়তে থাকা আলোচনাও তৃণমূলের জন্য ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
 
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষে অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো কিছু রাজনৈতিক বয়ান জনমনে প্রভাব ফেললেও মুখ্যমন্ত্রী পদে একাধিক নেতার উপস্থিতি তাদের সমর্থনকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তফসিলি জাতি এবং তরুণ ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।