শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
নিজের সংসারে বিলাসিতা নেই। নেই বিপুল অর্থের জোরও। তবু অন্যের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেওয়ার ইচ্ছেটা যেন সমস্ত অভাবকে ছাপিয়ে যায়। নিজের সীমিত সামর্থ্যকে বাধা না করে সেই সামর্থ্যকেই হাতিয়ার করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলেছেন নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের পাপিয়া কর। তাঁর হাতে তৈরি রাখি শুধু ভাই-বোনের ভালোবাসার বন্ধন নয়, সেই রাখি বিক্রির টাকায় জোটে ক্ষুধার্ত মানুষের একবেলার খাবার। তাই পাপিয়ার কাছে রাখি তৈরি নিছক একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর লড়াই।
বাড়ির মেঝেতে আলপনা। তার উপর বসে রঙিন সুতো, উল, জরি, কাগজ আর ছোট ছোট ঘট নিয়ে ব্যস্ত পাপিয়া। একের পর এক তৈরি হচ্ছে রাখি। প্রতিটি রাখির মধ্যে যেমন রয়েছে শিল্পীর নিপুণতা, তেমনই রয়েছে একটি মানবিক ভাবনা। তাঁর তৈরি ‘অন্নপূর্ণা রাখি’র নকশায় রয়েছে ছোট্ট একটি ঘট, তার মুখে ধানের শিষ এবং পাশে মাঙ্গলিক কড়ি। রং, উল ও জরি দিয়ে সাজানো সেই রাখি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনই তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সংকল্প।
পাপিয়ার ভাবনাটি সহজ। রাখি বাঁধা হয় প্রিয়জনের মঙ্গল কামনায়। আর অন্নপূর্ণার কাছে মানুষ প্রার্থনা করে অন্নের জন্য। এই দুই ভাবনাকেই তিনি এক সুতোয় বেঁধেছেন। তাই তাঁর কাছে ‘অন্নপূর্ণা রাখি’ শুধু উৎসবের সামগ্রী নয়, মানুষের জন্য কিছু করার একটি মাধ্যম।রাখির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের তৈরি রাখির ছবি ও খবর ছড়িয়ে দেন পাপিয়া। সেখান থেকেই আসে অর্ডার। উৎসবের মরসুমে বিক্রি বাড়ে। আর সেই বিক্রির টাকা থেকেই তিনি মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। হয়তো একটি রাখি বিক্রি হয়েছে সামান্য কয়েক দশক টাকায়, কিন্তু সেই টাকাই একসময় অন্য কারও দুপুরের খাবারের অংশ হয়ে ওঠে।
পাপিয়ার এই উদ্যোগ কোনও হঠাৎ তৈরি হওয়া ভাবনা নয়। বিয়ের আগেও রানাঘাটের বাড়িতে থাকতে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা ছিল তাঁর। হাতের কাজ তাঁর বরাবরের সঙ্গী। কখনও সুতো, কখনও কাগজ, কখনও মাটি নিয়ে কাজ করেছেন। দুর্গাপ্রতিমাও তৈরি করেছেন। শিল্প তাঁর কাছে শুধু নিজের সৃষ্টির আনন্দ নয়, সেই শিল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছনোরও একটি পথ।
অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে পাপিয়া ছুটে যান শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। রেলস্টেশনের ধারে, রাস্তার পাশে কিংবা উড়ালপুলের নীচে থাকা অসহায় মানুষদের জন্য রান্না করা খাবার নিয়ে পৌঁছে যান তিনি। সপ্তাহে একটি দিন ধর্মতলা এলাকার পথশিশুদের সঙ্গেও সময় কাটান। খাবার নিয়ে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে বসে খাওয়া, পড়াশোনা করা, হাতের কাজ শেখানো—সব মিলিয়ে সেই কয়েক ঘণ্টা হয়ে ওঠে আনন্দের সময়। খাবার দেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাটাকেও তিনি সমান গুরুত্ব দেন।
পাপিয়ার এই লড়াইয়ের পিছনে তাঁর পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী অমরেশ স্থানীয় বাজারে সবজি বিক্রি করেন। সংসারের আয় সীমিত হলেও স্ত্রীর কাজকে কখনও থামিয়ে দিতে চাননি। বরং প্রয়োজন হলে রাখি তৈরির কাজেও হাত লাগান। স্ত্রীর কাজের প্রশংসা শুনলে তাঁরও গর্ব হয়।
ছেলে হৃষিকেশ বর্তমানে একটি ব্যাঙ্কে কর্মরত এবং কাজের সূত্রে হালিশহরে থাকেন। দূরে থাকায় আগের মতো মায়ের কাজে নিয়মিত হাত লাগাতে পারেন না। তবে সুযোগ পেলেই মায়ের সঙ্গে বসে কাজ করেন। মায়ের এই উদ্যোগ নিয়ে তাঁরও গর্বের শেষ নেই।
পাপিয়ার জীবনে অভাব ছিল, এখনও অঢেল স্বচ্ছলতা নেই। কিন্তু অন্যের কষ্ট বোঝার জন্য বড়লোক হওয়ার প্রয়োজন হয় না—এই বিশ্বাসেই এগিয়ে চলেছেন তিনি। নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁকে পিছিয়ে দেয়নি। বরং সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও বেশি করে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছে।
তাঁর কাছে অন্নপূর্ণা কোনও দূরের দেবীমূর্তি নন। কোনও ক্ষুধার্ত মানুষ পেট ভরে খাওয়ার পর যখন তৃপ্তির হাসি হাসেন, সেই হাসির মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকে খুঁজে পান। তাই তাঁর হাতে তৈরি প্রতিটি রাখির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি মানবিক গল্প। ভাইয়ের কব্জিতে যখন সেই রাখি বাঁধা হয়, তখন হয়তো কেউ জানেনও না—তার রঙিন সুতোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্য এক মানুষের একবেলার খাবারের আশা।
পাপিয়ার গল্প আসলে শেখায়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, শ্রম এবং নিজের সামান্যটুকু অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা। সেই বিশ্বাস নিয়েই নিজের ঘরের অভাবকে জয় করে পাপিয়া বুনে চলেছেন রাখির সুতো। আর সেই সুতোয় ধীরে ধীরে জুড়ে যাচ্ছে আরও একটি বন্ধন—মানুষের সঙ্গে মানুষের, সামর্থ্যের সঙ্গে প্রয়োজনের এবং ভালোবাসার সঙ্গে অন্নের বন্ধন।