হিন্দু নারীর ‘সৌভাগ্যের প্রতীক’ শাঁখা গড়ে তুলছেন মুসলিম শিল্পীরাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বার্তা বাজিতপুরে

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
হিন্দু নারীর ‘সৌভাগ্যের প্রতীক’ শাঁখা গড়ে তুলছেন মুসলিম শিল্পীরাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বার্তা বাজিতপুরে
হিন্দু নারীর ‘সৌভাগ্যের প্রতীক’ শাঁখা গড়ে তুলছেন মুসলিম শিল্পীরাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বার্তা বাজিতপুরে
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

বাঙালি হিন্দু নারীর বিবাহিত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য চিহ্ন শাঁখা। শাস্ত্র মতে, শাঁখা ছাড়া বিয়ে অসম্পূর্ণ, এমন বিশ্বাস যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু এই পবিত্র প্রতীকের পেছনের শিল্পীরা যে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, সেই গল্প রাজ্যের মুর্শিদাবাদের ডোমকলের বাজিতপুর গ্রামটিকে বিশেষ করে তোলে। একই সঙ্গে তুলে ধরে বাংলার এক অগোচর, অথচ মর্মস্পর্শী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন।
 
মুর্শিদাবাদের বাজিতপুর, রাজ্যের শাঁখা শিল্পের আঁতুড়ঘর। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসবাহী এই অলংকার আজও দেশ-বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে এখানকার শিল্পীদের হাত ধরে। আর এই গ্রামে দাঁড়ালে বোঝা যায়, ধর্ম নয়, শিল্পই এখানে পরিচয়ের প্রথম সোপান।
 

গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ শাঁখা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। একসময় এই শিল্পে মূলত হিন্দু পরিবাররাই যুক্ত থাকলেও এখন সমান দক্ষতায় কাজ করছেন মুসলিম তরুণ-তরুণীরা। যাঁরা দিনভর ঘষেমেজে, কেটে-ছেঁটে প্রস্তুত করেন সেই শাঁখাই, যা হাতে পরলে হিন্দু নারীর ‘সৌভাগ্য’-এর প্রতীক বলে ধরা হয়।
 
চেন্নাই ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসে কাঁচামাল। তা বাজিতপুরে পৌঁছনোর পর শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শিল্পী সৈয়দ ইসলাম বাবু জানান, “শাঁখা তৈরি করতে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। কাটা থেকে গ্রাইন্ডিং, সবটাই নিখুঁতভাবে করতে হয়। তারপর শুরু হয় নকশার কাজ। দিনের পর দিন অনুশীলনে শিখেছি।”
 
শাঁখা শিল্পের কাজে ব্যস্ত কর্মীরা
 
এই গ্রামেরই রিন্টু সাহা প্রতিদিন বানান ২০০–৩০০ শাঁখা। কিন্তু পাশেই বসে মুসলিম তরুণ শিল্পীরাও একই তালে কাজ করেন। ধর্ম ভিন্ন হলেও শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এক, এমন দৃশ্যই এখানে রোজকার।
 
বাজিতপুরে রয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি ব্যবসায়ী। কলকাতা থেকে দিঘা, মালদহ, উত্তরবঙ্গ, এমনকি ত্রিপুরা, অসম ও বাংলাদেশেও রপ্তানি হয় এখানকার শাঁখা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দুর্গাপুজোর মরশুমে বাকি সময়ের তুলনায় বিক্রি বাড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ।
 
মুর্শিদাবাদের বাজিতপুরের শাঁখা শিল্পের নিদর্শন
 
ব্যবসায়ী সুখেন পাল বলেন, “বাবা-ঠাকুরদাদার আমল থেকে আমরা শাঁখা বিক্রি করি। নানা ডিজাইনের বালা, মানতাশা, চুড়ি, সবই বানানো হয়। আজ আমাদের সঙ্গে মুসলিম ভাইয়েরাও সমানভাবে এই শিল্প ধরে রেখেছেন।”
 
তবে শিল্পের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসার মাঝেই আক্ষেপও রয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, “বাজিতপুর রাজ্যের নাম করা শাঁখা শিল্পকেন্দ্র হলেও সরকারি সাহায্য মেলে না। লোন পাওয়াও কঠিন।”
 
শাঁখা তৈরির কাজে ব্যস্ত কর্মীরা
 
তবু অভিযোগের আড়ালেও বাজিতপুর গ্রামের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে অন্যত্র। এখানে একসঙ্গে বসে হিন্দু-মুসলিম শিল্পীরা তৈরি করেন সেই শাঁখা, যা হিন্দু নারীর মঙ্গল, দাম্পত্য, শুভ্রতার প্রতীক। ধর্ম আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য এক, শুভ হোক, মঙ্গল হোক।
 
বাজিতপুর যেন মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের দেয়াল যতই উঁচু হোক, বাংলার মাটিতে শিল্প-সংস্কৃতি তার চেয়েও বড়। আর শাঁখার সাদা-লাল দাগেই যেন লেগে থাকে দুই সম্প্রদায়ের মিলেমিশে বেঁধে রাখা এক অটুট বন্ধনের রঙ।