'অ্যাম্বুলেন্স দাদা' করিমুল হক: মানবতার পথে এক গ্রামবাংলার কিংবদন্তি”

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 6 d ago
বাইক অ্যাম্বুলেন্সের জনক, করিমুল হক
বাইক অ্যাম্বুলেন্সের জনক, করিমুল হক
 
জাভেদ আখতার / কলকাতা

ভারতের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রাম, দারিদ্র্য আর অগোচরে ঘটে যাওয়া মানবিক ছোট-বড় ঘটনাগুলো মিলিয়ে এক অপূর্ব জীবনচিত্র গড়ে ওঠে। সেই সাধারণ মানুষের জীবনেই কখনও কখনও জন্ম নেয় অসাধারণতা, যা সমাজকে নতুন আলো দেখায়। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির মালবাজারের রাজাডাঙা গ্রামের করিমুল হকের কাহিনি তেমনই এক আলো, যিনি আজ সারা দেশে পরিচিত ‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’ নামে। দারিদ্র্য, অভাব-অনাটন ও কঠিন বাস্তবতার মাঝেও যিনি নিজের একার শক্তিতে হাজারো প্রাণ বাঁচিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের সেবার জন্য না ধনসম্পদ লাগে, না সম্মানের পদ; লাগে শুধু করুণা আর অটল সংকল্প।
 
৭ জুন ১৯৬৮ সালে জন্ম নেওয়া করিমুল হক ছিলেন এক শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা স্বর্গীয় লালুয়া মুহাম্মদ ছিলেন দিনমজুর, আর পরিবারের অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। করিমুল রাজাডাঙা পেন্দা মহম্মদ হাই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও দারিদ্র্য তাদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি রেলস্টেশনে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন, এবং সেখান থেকেই তাঁর সেবার পথচলা শুরু। যাত্রীরা যে সামান্য বকশিশ দিতেন, তা নিজের প্রয়োজনের জন্য না রেখে অন্যের সহায়তায় ব্যবহার করতেন। এই ছোট ছোট বকশিশই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের বড় উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।
 
'অ্যাম্বুলেন্স দাদা' তাঁর বাইক অ্যাম্বুলেন্সে করে একটি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একটি দৃশ্য
 
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত আসে ১৯৯৫ সালে। তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেন কোনোভাবে মাকে হাসপাতালে নিতে। কিন্তু গ্রামের নিকটে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না, সাহায্য পাওয়াও সম্ভব হয়নি। চিকিৎসার অভাবে তার মায়ের মৃত্যু হয় ঘরেই। এই ঘটনা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়, এবং সেই দিনই তিনি শপথ নেন, তাঁর গ্রামে আর কেউ অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার কারণে মরবে না। এটাই হয়ে ওঠে তার জীবনের লক্ষ্য।
 
করিমুল নিজের সামান্য আয় ও বকশিশের টাকা জমিয়ে ঋণ নিয়ে একটি মোটরসাইকেল কেনেন। সেই মোটরসাইকেলটাই পরিণত হয় ‘বাইক অ্যাম্বুলেন্স’-এ। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি নিজের গ্রামসহ আশপাশের ২০টিরও বেশি গ্রামে অসুস্থ ও আহত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। সেসব অঞ্চলে রাস্তা ছিল ভাঙাচোরা, বিদ্যুৎ ছিল না, আর নিকটতম হাসপাতাল ছিল প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। এমন পরিস্থিতিতে করিমুলের বাইকই মানুষের জীবনরেখা হয়ে ওঠে। দিন-রাত যেকোনো বিপদে তিনি ছুটে যেতেন। ধীরে ধীরে মানুষ স্নেহভরে তাকে ডাকতে শুরু করে, “অ্যাম্বুলেন্স দাদা”।
 
'অ্যাম্বুলেন্স দাদা' একজন রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা করার একটি ছবি
 
করিমুল কারও কাছ থেকে কখনো টাকা নেননি। যা কিছু উপার্জন করতেন সবই ব্যয় করতেন পেট্রোল, ওষুধপত্র ও ফার্স্ট-এড কিট কেনায়। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি নিজের মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্সে ৫,৫০০-র বেশি মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। আজও তিনি মালবাজারের এক চা-বাগানে কাজ করেন এবং প্রায় ৫,০০০ টাকা মাসে উপার্জন করেন, যার পুরোটা ব্যয় করেন মানুষের সেবায়। শুধু রোগী পৌঁছে দেওয়া নয়, তিনি স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামবাসীদের প্রাথমিক চিকিৎসাও শেখাতে শুরু করেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবিরও আয়োজন করেন, যাতে মানুষ সামান্য অসুখেও সঠিক যত্ন পেতে পারে।
 
তাঁর সেবামূলক কাজ তাকে সমাজের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত করে। নিজের অল্প আয়ের মধ্যেই তিনি গ্রামে ‘আশা কি কিরণ’ নামে একটি ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলেন, যেখানে দরিদ্র মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা পায়। এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সেই এলাকায় আশীর্বাদ হয়ে ওঠে, যেখানে চিকিৎসার অভাবে বহু মানুষ প্রাণ হারাত। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেশজুড়ে লকডাউন চললেও করিমুল পিছিয়ে যাননি। তিনি দরিদ্র মানুষ ও পরিযায়ী শ্রমিকদের খাদ্য, বস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি দেখিয়ে দেন, সেবা ছোট-বড় নয়, নীতির সততা-ই আসল।
 
'অ্যাম্বুলেন্স দাদা' তাঁর বাইকে  করে একটি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একটি দৃশ্য
 
করিমুল হকের এই নিঃস্বার্থ সেবাকে ভারত সরকারও সম্মান জানায়। ২০১৭ সালে তাকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করা হয়। সেই মুহূর্ত থেকে তিনি শুধু তাঁর গ্রামের নয়, পুরো দেশের অনুপ্রেরণায় পরিণত হন। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি তিনি অভিনেতা সোনু সুদের সঙ্গে ‘কৌন বানেগা ক্রোড়পতি’ অনুষ্ঠানে হাজির হন। তার গল্পে সেদিন ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। একই বছর তাঁর জীবনভিত্তিক বই ‘বাইক অ্যাম্বুলেন্স দাদা’ প্রকাশিত হয়, যা লিখেছেন সাংবাদিক ও সমাজ উদ্যোক্তা বিশ্বজিৎ ঝাঁ এবং প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া।
 
তাঁর পরিবার আজও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করে। স্ত্রী অঞ্জুয়া বেগম, দুই ছেলে রাজু ও আহাছানুল এবং দুই বিবাহিত কন্যা আছে। ছেলে দু’জন পানের দোকান ও মোবাইল সারাইয়ের ছোট ব্যবসা চালায়। সামান্য উপার্জনের বেশিরভাগটাই চলে যায় জ্বালানি ও ওষুধে। তবু করিমুল বলেন, “কারও প্রাণ বাঁচাতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় লাভ।”
 
'অ্যাম্বুলেন্স দাদা' তাঁর বাইক অ্যাম্বুলেন্সে করে একটি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একটি দৃশ্য
 
তাঁর গল্প শেখায়, পরিবর্তন আনতে বড় সম্পদ লাগে না; লাগে বড় মন। তিনি দেখিয়েছেন, একজন মানুষও গোটা সমাজের চিত্র বদলে দিতে পারে। আজ তাঁর কাজ দেখে দেশ-বিদেশে অনেক জায়গায় বাইক অ্যাম্বুলেন্স চালু হয়েছে। তাঁর মিশন শুধু অসুস্থকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা যেন প্রত্যেক মানুষের অধিকার হয়, ধনী-গরিব, দূর-নিকট যাই হোক।
 
করিমুল হকের গল্প শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, এটা গোটা ভারতের গল্প। এমন এক গল্প, যা মনে করিয়ে দেয়, মানবতা আজও বেঁচে আছে। তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাবে, মনে যদি করুণা থাকে, অসম্ভব কিছুও অসম্ভব থাকে না।
 
আজও তিনি একই সাদামাটা জীবনে গ্রামে থাকেন, কোনো প্রদর্শন নয়, শুধু একটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে, “অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে কাউকে মরতে দেব না।” সেই প্রতিশ্রুতি-ই তাঁকে ভারতের সত্যিকারের ‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’ করে তুলেছে, এবং তাঁর গল্প আমাদের বিশ্বাস করায় যে, একজন মানুষও পুরো সমাজে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে।