নয়া দিল্লি
যে সময় সমাজজুড়ে ঘৃণা, অবিশ্বাস ও বিভাজনের ভাষা ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়েই কিছু ঘটনা মানবতার প্রকৃত রূপ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। উত্তর প্রদেশের বারেলি শহরে ঘটে যাওয়া এমনই এক সাহসী ঘটনা মনে করিয়ে দেয়; ধর্ম, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নয়, সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় পরিচয়। বারেলির ৬০ বছর বয়সী গৃহস্থালি আবর্জনা সংগ্রাহক আব্দুল তাঁর নিঃস্বার্থ সাহসিকতার মাধ্যমে দুই নারীর প্রাণ বাঁচিয়ে সেই মানবিক সত্যকে আবারও প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বারেলি শহরে আবর্জনা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা বৃদ্ধ আব্দুল এক অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করে দুই নারীর প্রাণ রক্ষা করে অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। যখন প্রাণনাশের আশঙ্কায় প্রতিবেশীরা নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছিল, তখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আব্দুল এগিয়ে এসে ওই দুই নারীকে বাঁচান।
আব্দুলের সময়োচিত ও সাহসী এই পদক্ষেপের ফলেই হামলাকারী ধরা পড়ে এবং পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পশুপ্রেমী শালিনী অরোরা সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট ও ভিডিওর মাধ্যমে এই ঘটনার কথা শেয়ার করেন।
শালিনী জানান, “আমি তখন আমার গৃহসহায়িকার সঙ্গে বাড়ির ভেতরে ছিলাম। হঠাৎই এক ব্যক্তি বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। সে আমাকে হুমকি দিয়ে এগিয়ে এলে আমি ভীষণভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সাহায্যের জন্য চিৎকার করতেই সে আমার মাথায় আঘাত করে। আমার কান্নার শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও প্রতিবেশীদের কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেননি।”
তিনি আরও বলেন, “ঠিক সেই সময় আব্দুল নামের এক বৃদ্ধ ব্যক্তি একটি আবর্জনা সংগ্রহের গাড়ি নিয়ে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার চিৎকার শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতরে ছুটে আসেন এবং হামলাকারীকে ধরে ফেলতে সাহায্য করেন।”
এই ঘটনার পর শালিনী অরোরা সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, আব্দুলের এই কাজ প্রমাণ করে, ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণির পার্থক্যের ঊর্ধ্বে মানবতাই সর্বশ্রেষ্ঠ। তার এই বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
পরে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে শালিনী জানান, তখন সময় ছিল প্রায় রাত ১১:১৫। তিনি বাড়ির ভেতরে তার সহায়িকার সঙ্গে কাজ করছিলেন। হঠাৎ চুরির উদ্দেশ্যে এক অচেনা ব্যক্তি ঘরে ঢুকে পড়ে। সেই সময় তার কুকুরটি লোকটির পায়ে কামড়ে তাকে ফেলে দেয়। তখন ওই ব্যক্তি কুকুরটির মাথায় আঘাত করতে থাকে। এক হাতে লাঠি ও অন্য হাতে ইট নিয়ে সে বারবার কুকুরটিকে আঘাত করে।
এই দৃশ্য দেখে শালিনী সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন এবং তার সহায়িকাও ছুটে আসেন। এরপর লোকটি দু’জনকেই আক্রমণ করে। ইট দিয়ে শালিনীর মাথায় আঘাত করার পর আবার একটি পাত্র তুলে নিয়ে আঘাত করে। দু’জন নারীই হামলাকারীকে সামলাতে না পেরে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করতে থাকেন। কিন্তু কোনো প্রতিবেশী সাহায্যে এগিয়ে আসেননি; মানুষজন কেবল পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে দৃশ্যটি দেখছিল। শালিনী বহুবার ১১২ নম্বর জরুরি নম্বরে ফোন করার চেষ্টা করলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
ঠিক সেই সময় কাছাকাছি আবর্জনা সংগ্রহ করছিলেন আব্দুল। তিনি শালিনীর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুর্বল ও বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখেন, চোরটি ইতিমধ্যেই দুই নারীকে আক্রমণ করছে।
নিজের জীবনের কথা না ভেবে আব্দুল হামলাকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। চোরটি আব্দুলের মাথায়ও আঘাত করে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে আব্দুল হামলাকারীর মুখ শক্ত করে চেপে ধরেন। আব্দুলের আঙুলের আঘাতে চোরটি গুরুতর আহত হয়। শেষ পর্যন্ত অন্যরাও সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং হামলাকারীকে বেঁধে ইজ্জত নগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
শালিনী বলেন, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়; কীভাবে একজন মুসলিম ব্যক্তি নিজের জীবনের পরোয়া না করে তাদের প্রাণ রক্ষা করেছেন। সেই মুহূর্তেই তিনি উপলব্ধি করেন, ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রকৃত অর্থ মানবতা; অথচ ধর্মকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এই ঘৃণার সময়ে মানুষের উচিত ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। বেরেলিকে গঙ্গা-যমুনি সংস্কৃতির শহর বলা হয়, যেখানে সম্প্রীতির বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বারেলি বিখ্যাত কবি ওয়াসিম বারেলভির শহর, এই সংস্কৃতি কখনো দুর্বল হতে দেওয়া উচিত নয়। তার কথায়, “ভালোবাসা সবসময় প্রবাহিত হওয়া উচিত, আর বেরেলির উচিত পৃথিবীর কাছে শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।”
পরে শালিনী আরেকটি ভিডিওর মাধ্যমে আব্দুলকে জনসাধারণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, কারণ এই ঘটনার পর অনেক শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু, পরিচিতজন ও সংবাদমাধ্যম থেকে ফোন আসছিল, কে তাদের প্রাণ বাঁচাল এবং তিনি কেমন আছেন, তা জানার জন্য।
ভিডিওতে আব্দুল বলেন, “আমি মানুষকে হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে ভাগ করতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমার সব গ্রাহকই হিন্দু, আর তারা কখনো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি।”