হোস্টেলের আড্ডা, এক বান্ডিল বিড়ি আর AMU-তে স্বপ্ন দেখা দুই বন্ধু আসগর ওয়াজাহাত-মুজাফ্ফর আলির অজানা ছাত্রজীবনের গল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
হোস্টেলের আড্ডা, এক বান্ডিল বিড়ি আর স্বপ্ন দেখা দুই বন্ধু আসগর ওয়াজাহাত-মুজাফ্ফর আলির মনোরম কাহিনি
হোস্টেলের আড্ডা, এক বান্ডিল বিড়ি আর স্বপ্ন দেখা দুই বন্ধু আসগর ওয়াজাহাত-মুজাফ্ফর আলির মনোরম কাহিনি
 
মালিক অসগর হাশমী

হিন্দি সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ সগর ওয়াজাহাত মূলত উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরের সন্তান। যৌবনের দোরগোড়ায় পা রাখতেই তাঁর প্রবল ইচ্ছা ছিল এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার। কিন্তু তাঁর মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল, “পড়াশোনা যদি করতেই হয়, তবে শুধু আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU)-তেই।” এর কারণও ছিল স্পষ্ট। তাঁর মাতুলালয়ের কয়েকজন সদস্য তখন AMU-তে অধ্যাপকের পদে কর্মরত ছিলেন। তাই মন না চাইলেও শেষ পর্যন্ত অসগর ওয়াজাহাতকে AMU-র হোস্টেলেই গিয়ে উঠতে হয়।
 
ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! হোস্টেলে পা রাখতেই তাঁর পরিচয় হয় মুজাফ্ফর আলির সঙ্গে, যিনি পরবর্তীকালে ‘উমরাও জান’-এর মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করেন। দু’জনেই কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের মন-প্রাণ যেন অন্য এক জগতে বাস করত। পড়াশোনার চেয়ে শিল্প, সাহিত্য আর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিতেই তাঁদের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। এ দু’জন বন্ধুর কাছে সেটাই ছিল প্রকৃত পাঠ্যসূচি।
 

বিড়ির বান্ডিল আর গার্ড সাহেবের দয়া!
 
দিন-রাত ঘুরে বেড়ানো এই দুই বন্ধুর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল হোস্টেলের মূল ফটক আর সেখানে বসে থাকা কঠোর প্রহরী। নির্ধারিত সময়ের পরে ফিরলেই তাঁর নাম রেজিস্টারে উঠত, আর তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে এমন জবাবদিহি করতে হতো যে তা সহজে ভোলার নয়। কিন্তু সগর ওয়াজাহাত আর মুজাফ্ফর আলিও কম বুদ্ধিমান ছিলেন না। খুব তাড়াতাড়িই তাঁরা গার্ডের দুর্বলতা বুঝে ফেলেছিলেন, এক বান্ডিল বিড়ি।
 
প্রতিদিন গভীর রাতে হোস্টেলে ফেরার সময় তাঁদের পকেটে একটি নতুন বিড়ির বান্ডিল থাকত। সেই ‘উপহার’ হাতে পেয়েই গার্ড সাহেবের কঠোর মন নরম হয়ে যেত। বিড়ির বান্ডিল পকেটে রেখে তিনি চোখ টিপে বলতেন, “আজকের মতো ছেড়ে দিলাম, কিন্তু কাল থেকে সময়মতো ফিরবে।” দু’জনেই অত্যন্ত ভদ্র মুখ করে আশ্বাস দিতেন, “অবশ্যই চাচা!” কিন্তু পরের দিন আবার একই কাণ্ড, একই বিড়ির বান্ডিল, একই ‘রিশওয়ত’(ঘুষ), আর একই দেরি করে ফেরা।
 
‘মৌলানা ঘোড়ি’ আর পানের অজুহাত
 
AMU-তে তাঁদের একটি বিষয় ছিল ‘শিয়া থিয়োলজি’। এই বিষয়ের শিক্ষক মৌলানা সাহেবের আসল নাম আজ প্রায় বিস্মৃত। কারণ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘মৌলানা ঘোড়ি’ নামেই চিনত। মৌলানা সাহেব ছিলেন প্রবল পানপ্রেমী। সবসময় তাঁর সঙ্গে একটি রুপোর পানের ডিব্বা থাকত। আর এই অভ্যাসকেই কাজে লাগাতেন সগর ওয়াজাহাত। ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে এটাই ছিল সবচেয়ে কার্যকর অজুহাত। মৌলানার পান শেষ হওয়ার মুখে তিনি ভদ্র ছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে বলতেন, “মৌলানা সাহেব, আমি কি আপনার জন্য পান নিয়ে আসব?” এরপর পান আনার অজুহাতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেন, আর তাঁর দেখা মিলত সরাসরি পরের দিন।
 

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সুপারিশ আর ‘অর্ধেক দামে বই বিক্রি’

এরপর এল পরীক্ষার সময়। কেমিস্ট্রির প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় পাশ করার কোনো সম্ভাবনাই চোখে পড়ছিল না। তাই দু’জনে ঠিক করলেন, যদি একটু সুপারিশের ব্যবস্থা করা যায়। তাঁরা হিন্দি বিভাগের এক সরল-সোজা শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে কেমিস্ট্রির অধ্যাপকের কাছে গিয়ে সুপারিশ করালেন। অধ্যাপক তাঁদের দিকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার তাকিয়ে বললেন, “এরা কারা? আমি তো আজ পর্যন্ত এদের আমার ক্লাসে দেখিইনি!”
 
এই উত্তর শুনে তাঁদের সব আশাই মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। মন খারাপ করে দু’জনে বেরিয়ে এলেন। তখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে তাঁরা ফেল করবেন। কিন্তু হতাশ হয়ে বসে থাকার বদলে তাঁরা এমন কাজ করলেন, যা সম্ভবত কেবল তাঁরাই করতে পারতেন।
 
দু’জনে তাঁদের কেমিস্ট্রির একেবারে নতুন বইগুলো অর্ধেক দামে এক কবাড়িওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকায় সোজা চলে গেলেন ‘পেকার হোটেল’-এ। সেখানে জমিয়ে মুর্গ-মুসাল্লম খেলেন, তারপর সিনেমা হলে গিয়ে একটি ছবি উপভোগ করলেন। সবশেষে যে যার বাড়ির উদ্দেশে ট্রেনে চেপে রওনা দিলেন। বাড়ি পৌঁছে অবশ্য পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ভালোই বকুনি খেতে হয়েছিল তাঁদের।