সানিয়া আঞ্জুম
লাইভ নিউজরুমের দ্রুতগতি আর কর্পোরেট কমিউনিকেশনের পরিকল্পিত ছন্দ, এই দুই ভিন্ন জগতকে একসূত্রে বেঁধেছেন আয়েশা তাবাসসুম তার গল্প বলার ক্ষমতায়। তার কাছে পেশা মানেই শুধু কাজ নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতাকে ছুঁয়ে যাওয়ার এক মাধ্যম। মাউন্ট কার্মেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মুম্বইয়ের টাইমস নাউ-এ টেলিভিশন সাংবাদিকতা দিয়ে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন, সঙ্গে ছিল অদম্য আগ্রহ আর নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ।
“ক্যারিয়ারের শুরুতে আমি অনেক শো সামলাতাম, প্রথমে প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে, তারপর ধীরে ধীরে অ্যাসোসিয়েট প্রডিউসার হয়ে উঠি,”, তিনি স্মরণ করেন। খুব তাড়াতাড়িই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, সাংবাদিকতার প্রকৃত দক্ষতা ক্যামেরার সামনে নয়, বরং ক্যামেরার আড়ালেই গড়ে ওঠে। “ক্যামেরার সামনে যা দেখা যায়, তা গল্পের একটা অংশ মাত্র। কিন্তু পিছনে যে এডিটিং, গল্প লেখার ধরন, ভিজ্যুয়ালের উপস্থাপনা, এসবই আসলে গল্পকে প্রাণ দেয়।”
আয়েশা তাবাসসুম
আয়েশার কাছে গল্প বলা মানে শুধু তথ্য পরিবেশন নয়। “গল্প যদি মানুষের মনে না লাগে, তাহলে তা কখনোই কারও হৃদয় ছুঁতে পারবে না”, এই বিশ্বাসই তাকে পথ দেখিয়েছে তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে।
২০০৮ সালে, সাংবাদিকতার মাত্র দ্বিতীয় বছরে, তিনি মুম্বইয়ে ২৬/১১ সন্ত্রাসী হামলার খবর কভার করেন, তখন তিনি ইউটিভিআই-এ কর্মরত। “সেই রাতটা আজও স্পষ্ট মনে আছে,” তিনি বলেন। একটি সাধারণ বিজনেস বুলেটিন শেষ করার পরেই আচমকা কোলাবায় গুলির খবর আসে, আর মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বড় চ্যানেলগুলোর তুলনায় সীমিত সম্পদ নিয়ে আয়েশা ও তার তরুণ দলকে ভরসা রাখতে হয়েছিল নিজের উপস্থিত বুদ্ধি ও স্থিরতার ওপর।
তিনি বলেন “একটা সন্ত্রাসী হামলায় ঠিক কী হচ্ছে, তা কেউ জানত না… শুধু প্রস্তুত থাকতে হতো। আর গল্পটা তুলে ধরতে হতো”। যদিও তিনি মাঠে রিপোর্টিং করেননি, প্রোডাকশন কন্ট্রোল রুমে থেকে আউটপুট সামলাচ্ছিলেন, তবুও দায়িত্ব ছিল বিশাল। “প্রডিউসার হিসেবে দর্শকদের কাছে কীভাবে বার্তা পৌঁছানো হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।” প্রায় দুই দশক পরও তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, “আমি সেখানে ছিলাম, এটা আজও আমার কাছে গর্বের।”
আয়েশা তাবাসসুম বলিউড অভিনেত্রী তাপসী পান্নুর ইন্টারভিউ নেওয়ার মুহূর্তে
চার বছর মুম্বইয়ে কাটানোর পর তিনি বেঙ্গালুরুতে ফিরে আসেন এবং বিজ্ঞাপনের জগতে প্রবেশ করেন। তিনি মনে করেন, “আমার গড়ে ওঠা সাংবাদিকতা আর বিজ্ঞাপন, এই দুইয়ের মিশ্রণে।” সাংবাদিকতা তাকে শিখিয়েছে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে, “সব পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে রিপোর্ট করতে হয়, শুধু দেখা নয়, শোনা, গন্ধ পাওয়া, এমনকি অনুভব করাও।” অন্যদিকে বিজ্ঞাপন তাকে শিখিয়েছে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে, “শুধু পণ্য বিক্রি নয়, মানুষের মনে কী চলছে, সেটাও বুঝতে হয়।”
দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ‘ইনডালজ’-এ প্রায় ছয় বছর কাজ করার সময় তিনি কপিল দেব, কমল হাসান, সুনীল শেঠির মতো তারকাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক গভীর মানবিক সত্য।
তিনি বলেন “স্পটলাইটের বাইরে মানুষগুলোও আমাদের মতোই, তাদেরও আছে সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা,”। সুনীল শেঠির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের কথা তিনি বিশেষভাবে মনে রাখেন, যখন তাড়াহুড়োর মধ্যেও তিনি বলেছিলেন, “না, ওকে প্রশ্নগুলো শেষ করতে দিন, সময় আছে।” এই ছোট্ট ঘটনাই আয়েশার কাছে বড় শিক্ষা হয়ে থাকে, খ্যাতির চেয়ে মানুষের আচরণই বেশি মূল্যবান। “খ্যাতি ক্ষণস্থায়ী… আসল বিষয় হলো আপনি মানুষকে কীভাবে আচরণ করেন।”
আয়েশা তাবাসসুম একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে
বর্তমানে আয়েশা বেঙ্গালুরু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট লিমিটেড-এ কনটেন্ট লিড হিসেবে কর্মরত, গত বছরই তিনি এই পদে উন্নীত হন। এই দায়িত্বে তিনি ফিল্ম, রিপোর্ট, বড় ইভেন্টের কনটেন্ট, ভাষণ লেখা, রেডিও ক্যাম্পেইন, ইনফ্লুয়েন্সার সহযোগিতা, সবকিছুই দেখভাল করেন। পাশাপাশি, তিনি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও পরিচালনা করেন, যা সংস্থার ভেতরের গল্পগুলোকে সঠিকভাবে তুলে ধরে।
এই ভূমিকায় তার সাংবাদিকতার দ্রুততা, বিজ্ঞাপনের সূক্ষ্মতা এবং ফিচার লেখার গভীরতা, সব একসাথে মিলেছে। “যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষই থাকে” এই বিশ্বাসেই তিনি কাজ করে চলেছেন।
এত সাফল্যের পরও আয়েশা বিশ্বাস করেন, শেখার শেষ নেই। “মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেখা থামে না” তিনি স্পষ্টভাবে বলেন। ইয়াহু ইমেইল থেকে শুরু করে আজকের এআই যুগ, সব পরিবর্তনকেই তিনি গ্রহণ করেছেন খোলা মনে। “সবচেয়ে জরুরি হলো খোলা মন আর নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।”
একজন মুসলিম নারী হিসেবে মিডিয়া ও যোগাযোগের জগতে কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রতিনিধিত্ব ও সমাজের সমর্থন নিয়েও ভাবেন। “আমার মতো আরও অনেকেই আছেন, যাদের অসাধারণ সম্ভাবনা আছে… আমি একা নই।” তবে তিনি মনে করেন, পরিবারের সমর্থনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। “পরিবারের বিশ্বাস না থাকলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় না।” তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার বাবা-মা ও ভাইয়ের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন।
নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি কোনো একটি শিখর নির্ধারণ করতে চান না। প্রথম প্রাইম-টাইম পিস টু ক্যামেরা, অ্যাসিড অ্যাটাক বেঁচে থাকা নারীর কণ্ঠ তুলে ধরা, একটি গভীর ফিচারের জন্য প্রশংসা পাওয়া, কিংবা শতাধিক সহকর্মীর সামনে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, প্রতিটি মুহূর্তই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন “আমার কাছে কোনো একক সেরা মুহূর্ত নেই… প্রতিটি মুহূর্তই উপভোগ করার জন্য”।
সব মিলিয়ে, আয়েশা তাবাসসুমের যাত্রা কেবল প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তন নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতা। লাইভ সন্ত্রাসী ঘটনার কভারেজ থেকে আন্তর্জাতিক তারকাদের সাক্ষাৎকার, আর আজ ভারতের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দরে বহু-মাধ্যমের কনটেন্ট নেতৃত্ব, সবকিছুর মাঝেও তার মূল মন্ত্র একটাই: মানুষ আগে।বিশ্বাসে দৃঢ়, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং শেখার অদম্য ইচ্ছায় চালিত, তার গল্প এগিয়ে চলেছে, প্রতিনিয়ত নতুন রূপে, নতুন সংযোগে, একটি গল্প থেকে আরেকটি গল্পে।