জুবিনহীন প্রথম বৈশাখ: উৎসবের মাঝে গভীর শূন্যতার সুর
Story by atv | Posted by Aparna Das • 1 Months ago
জুবিনহীন প্রথম বৈশাখ: উৎসবের মাঝে গভীর শূন্যতার সুর
নিকুঞ্জ নাথ
প্রকৃতির বুকে আবার ফিরে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। কোকিল-কেতেকীর মধুর ডাক, কপৌ ফুলের সুবাস আর ঢোল-পেপার গুমগুম ধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে। অসমিয়াদের প্রাণের উৎসব রঙালী বিহু এখন দুয়ারে। কিন্তু এবারের বিহুতে আগের মতো সেই উন্মাদনা আর স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ নেই। উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে গোটা রাজ্য জুড়ে ছায়া ফেলেছে এক গভীর বিষাদ আর শূন্যতা। কারণ, এই বছরের ' বহাগ' ( বৈশাখ) বিহুতে আমাদের মাঝে নেই অসমিয়াদের প্রাণের শিল্পী, যুবপ্রজন্মের হৃদস্পন্দন জুবিন গার্গ।
বুকভরা যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে আজও যেন প্রতিটি অসমিয়া সেই চিরন্তন অথচ নির্মম সত্যটিকে বিশ্বাস করতে কষ্ট পাচ্ছে। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর অসমের জাতীয় জীবন থেকে অকালে হারিয়ে যাওয়া এই মহান শিল্পীর অনুপস্থিতি আজ প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছে সমগ্র রাজ্যবাসী। জুবিন গার্গবিহীন বিহু অসমিয়াদের জন্য এক অস্বীকার্য, এমনকি কল্পনারও অতীত ঘটনা। কীভাবে আজ অসম এই বিহু উদযাপন করবে? যিনি অসম ও অসমিয়াদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন, যার কণ্ঠের জাদুতে রাতের পর রাত বিহুর মঞ্চগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠত, তাঁর অনুপস্থিতিতে এই প্রিয় উৎসব সত্যিই শূন্য, নিস্তব্ধ।
জুবিন গার্গ শুধু একজন গায়ক নন, তিনি নিজেই এক বিশাল প্রতিষ্ঠান। অসমের শিল্প-সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিসর তাঁর অভাবে আজ সত্যিই অসম্পূর্ণ। প্রতিটি রঙালী বিহুর মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল উন্মাদনার উৎস। তাঁর একটি গান শোনার আকাঙ্ক্ষায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন।
এবারও বিহুর মঞ্চগুলো জমকালোভাবে সাজানো হবে, বিহু নর্তক-নর্তকীরা নাচে মেতে উঠবেন, কিন্তু মঞ্চ থেকে আর ভেসে আসবে না সেই চিরচেনা, উন্মাদনাময় কণ্ঠ, “মোর কোনো জাতি নাই, মোর কোনো ধৰ্ম নাই, মই কাঞ্চনজংঘা…”। “ঐ নাহর ফুলার বতর…”, “জানমণি ঐ আকাশখন ধুনীয়া…”, “মায়া, মায়া মাথোঁ মায়া…”, “মায়াবিনী রাতির বুকুত…”, “কার পরশ, কার সুবাস…” কিংবা “সোণরে সজা পঁজা…” এমন কালজয়ী গানগুলো আর কখনো তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে মঞ্চে শোনা যাবে না। বোহাগের এক ঝাঁক বৃষ্টির মাঝে তাঁর গাওয়া “এজাক বরষুণে মোক ধুই থৈ গ’ল” গানের তালে তালে ভক্তদের যে উন্মাদনা সৃষ্টি হতো, সেটিও এবার চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে থাকবে। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিহুর মণ্ডপগুলোয় বিরাজ করবে এক নিঃশব্দ শূন্যতা। অসমের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে তিনি যেভাবে বিহুর আনন্দ বিলিয়ে বেড়াতেন, সেই মধুর স্মৃতি আজ প্রতিটি অসমিয়ার চোখে জল এনে দেয়।
‘রকস্টার’ জুবিন গার্গ
অসমিয়াদের কাছে বিহু মানেই ছিল জুবিন গার্গ। অথচ সেই বিহুর সম্রাটই আজ আর নেই। তাই এবারের বিহু যেন বিহু হয়ে উঠতে পারেনি, বরং তা এক গভীর বেদনায় পরিণত হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে আজকের ' বহাগ' শূন্য-নিস্তব্ধ। প্রকৃতিকে অপরিসীম ভালোবাসা, মানবদরদী ও পরোপকারী এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের বহু রঙালী বিহু কমিটি এবারের উৎসব অনাড়ম্বরভাবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহু বিহু সমিতি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঞ্চ তাঁর নামে উৎসর্গ করেছে। প্রতিটি বিহু কমিটি তাঁর ছবি সম্বলিত হোর্ডিং-পোস্টারে মঞ্চ সজ্জিত করেছে।
জুবিন গার্গবিহীন এই প্রথম বোহাগ কীভাবে উদযাপন করবে অসমিয়া সমাজ? শিল্পীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সঙ্গীতশিল্পী পার্থপ্রতিম গোস্বামী নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “জুবিন গার্গ সবসময় একটি কথা বলতেন, ‘লাইফ শুড গো অন’ (Life should go on)। পৃথিবী কারো জন্য কখনো থেমে থাকে না। জুবিন সবসময় চাইতেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো চলতে থাকুক। নিজের দুঃখ, নিজের আবেগ, এগুলো প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অনুভূতি; এগুলো কাউকে বোঝানো যায় না। আজ অসমের প্রতিটি মানুষ গভীর শোকে আচ্ছন্ন। কিন্তু এই শোকের মধ্য দিয়েই আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। জুবিন যেসব কাজ ভালোবাসতেন, সেগুলো আমাদের যত্নসহকারে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
এভাবে অনুষ্ঠানসূচিতে বিহু মঞ্চে গান পরিবেশন করতে আর আসবেন না প্রাণের শিল্পী জুবিন গার্গ
একইভাবে, জুবিনের প্রধান বাদ্যযন্ত্রী রাজা বরুয়াও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “জুবিন যদিও আমাদের মধ্যে আর নেই, তবুও আমি এই কথাটি মানতে পারি না। তিনি যেন এখনও আমার সঙ্গেই আছেন, এমনটাই অনুভব হয়। কিন্তু যখন মঞ্চে পরিবেশন করতে উঠি, তখন তাঁর অভাব গভীরভাবে অনুভব করি। জুবিন গার্গ প্রকৃতপক্ষে একজন ‘রকস্টার’ ছিলেন, হয়তো এই বিষয়টি কখনো সেভাবে আলোচিত হয়নি। তিনি সবসময় নতুনত্বের সন্ধানে থাকতেন, নতুন নতুন কথা বলতেন এবং মানুষের সঙ্গে খোলামেলা মিশে আনন্দ করতেন।”
জুবিন গার্গ অভিনীত শেষ জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘রৈ রৈ বিনালে’-এর সহ-অভিনেতা জয় কাশ্যপও বোহাগের এক বিকেলে প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করে সামাজিক মাধ্যমে একটি আবেগঘন ভিডিও শেয়ার করেছেন। হৃদয়ে গভীর বেদনা নিয়ে তিনি বলেন, “আজ এই বসন্তের বিকেলটি বড় বিবর্ণ লাগছে। তাঁর গ্রামের বিহুতলি আজ বড় নীরব-নিস্তব্ধ। তিনি নেই… আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। অথচ আগের মতোই চারপাশে ফুল ফুটে উঠেছে। আমাকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে তিনি কী পেলেন বা পেলেন না, আমি জানি না। অথচ আমি তাঁকে চিরদিনের জন্য হারালাম। যিনি একদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বসন্তের প্রথম বৃষ্টিতে আমরা একসঙ্গে ভিজব, আজ তিনিই আমাদের পাশে নেই। জুবিনদা ছাড়া এই প্রথম বোহাগ কীভাবে কাটাব, আমরা জানি না। আজ আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করছি, হয়তো আপনারাও তাই অনুভব করছেন। তাঁকে খুব মনে পড়ে, বিশেষ করে সিনেমার শুটিংয়ের সেই সময়গুলো খুব মনে কষ্ট দেয়… আমরা তাঁকে কখনো হারাতে পারি না। যতদিন আমাদের জীবন আছে, ততদিন জুবিনদা আমাদের মাঝেই বেঁচে থাকবেন।”
এদিকে, জুবিন গার্গবিহীন এই প্রথম 'বহাগে' প্রিয় শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণমণি চুতিয়া একটি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এবারের বিহু মঞ্চে গান পরিবেশনের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেবেন না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বোহাগ মানেই জুবিন গার্গ, বিহু মানেই জুবিন গার্গ। তাই এবারের বিহু মঞ্চে শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্রীদের পারিশ্রমিক ছাড়া আমি নিজের কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করব না।”
হাজার হাজার গান পরিবেশন করে জুবিন গার্গ শুধু রেকর্ডই গড়েননি, তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও অমূল্য সৃষ্টির মাধ্যমে অসমীয়া সংগীত জগতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা ইতিহাসে চিরকাল সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর গান ছাড়া অসমিয়াদের বিহু যে চিরদিনের জন্য অপূর্ণ থেকে যাবে, তা আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রত্যেকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করছে।
শারীরিকভাবে জুবিন গার্গ আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও, তাঁর অমর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে। 'বহাগ' - এর প্রতিটি মুহূর্তে, ঢোলের প্রতিটি তালে আর পেপার প্রতিটি সুরে তিনি প্রতিটি অসমিয়ার হৃদয়ে চিরজীবী হয়ে থাকবেন। তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য বিহু গান আগামী প্রজন্মকেও এই উৎসবের প্রকৃত আনন্দ ও উন্মাদনা অনুভব করাবে। জুবিনবিহীন এই প্রথম রঙালী বিহুতে তাঁর অমর সৃষ্টিকে স্মরণ করে অশ্রুসজল নয়নে সমগ্র অসম তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানাবে। কারণ, জুবিন গার্গ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি অসমিয়াদের এক চিরন্তন আবেগ, আর এই আবেগের কখনো মৃত্যু হয় না।