রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায় বাংলা, পরিযায়ী শ্রমিক ও মহিলা ভোটেই কি নির্ধারিত হবে নবান্নের ভাগ্য?
দেবকিশোর চক্রবর্তী
রবিবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে ছিল এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে জমে উঠেছিল উৎকণ্ঠা। পাড়ার চায়ের দোকান, মোড়ের আড্ডা, সবখানেই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস না ভারতীয় জনতা পার্টি, কার দখলে যাবে ক্ষমতা? তবে সেই আলোচনা আর পাঁচটা দিনের মতো সরব ছিল না, বরং ছিল নিচু স্বরে, সতর্কতায় মোড়া। কারণ ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে পশ্চিমবঙ্গ-এ এখনও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী।
তিনবারের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, তারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের ক্ষমতায় ফিরছে। অন্যদিকে বিজেপিও সমান আত্মবিশ্বাসী, তাদের মতে, এবারের নির্বাচনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তাদের জয় নিশ্চিত করেছে। এই পাল্টাপাল্টি দাবির মাঝেই সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য, রাজ্যের তখতের রং কি সবুজই থাকবে, নাকি গেরুয়ায় রাঙাবে নবান্ন?
সোমবার সকাল আটটা থেকে শুরু হয়েছে ভোটগণনা। রাজ্যের মোট ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে গণনা চলছে। ফলতা কেন্দ্রের গণনা স্থগিত রয়েছে অনিয়মের অভিযোগের কারণে। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে মোট ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে চলছে এই প্রক্রিয়া। কোথাও ১০ রাউন্ড, কোথাও আবার সর্বাধিক ২৭ রাউন্ড পর্যন্ত গণনা হবে। মেটিয়াবুরুজ, সপ্তগ্রাম ও বীজপুরে কম রাউন্ডে গণনা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও চুঁচুড়ায় দীর্ঘতম গণনা প্রক্রিয়া চলবে। পোস্টাল ব্যালটের গণনা শেষ হওয়ার পরেই শুরু হচ্ছে ইভিএমের ফল খোলা।
তবে এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক শক্তি হতে পারে দুই বিশেষ ভোটব্যাঙ্ক, পরিযায়ী শ্রমিক ও মহিলা ভোটাররা।
করোনা পরবর্তী সময়ে রাজ্যের বাইরে কাজ করতে যাওয়া বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক এবার ভোট দিতে ফিরে এসেছিলেন। অনেকের মতে, এই ভোটাররা এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও সচেতনভাবে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলেছে জীবিকার অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ফলে তাঁদের ভোট কোন দিকে গিয়েছে, তা ফলাফলে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
অন্যদিকে, মহিলা ভোটারদের গুরুত্বও এবার বিশেষভাবে উঠে এসেছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প, আর্থিক সহায়তা ও নারীকল্যাণমূলক উদ্যোগের কারণে মহিলাদের ভোট আচরণে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই বৃহৎ ভোটব্যাঙ্ক কোন দিকে ঝুঁকেছে, তা নির্ধারণ করতে পারে ক্ষমতার পালাবদল হবে কি না।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার সকাল থেকেই কার্যত রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায় রয়েছে গোটা বাংলা। রাজনৈতিক দলগুলির নেতারা আশাবাদী বক্তব্য রাখলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল, উদ্বেগ ও উত্তেজনা মিলেমিশে এক অনন্য আবহ তৈরি করেছে।ও টিভির সামনে বসে, মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে, কিংবা গণনাকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে, সবাই অপেক্ষা করছে একটাই উত্তরের জন্য।
শেষ পর্যন্ত কি আবারও নবান্নে ফিরবে পুরনো শাসকদল, নাকি নতুন শক্তির উত্থান ঘটবে? এই প্রশ্নের জবাব মিলবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। তবে যতক্ষণ না শেষ ফল ঘোষণা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়।