উৎসব যখন মিলনের সেতুবন্ধন: ঈদ ও জামাইষষ্ঠীর আঙিনায় বাংলার সম্প্রীতির পাঠ

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

বাংলার সমাজজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলির মধ্যে অন্যতম হল তার বহুত্ববাদী সংস্কৃতি। এখানে ধর্ম, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্নতা কখনও বিভেদের কারণ হয়ে ওঠেনি; বরং সেই বৈচিত্র্যই বারবার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সহাবস্থানের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। উৎসবের সময় সেই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ বাংলার উৎসব মানেই কেবল একটি সম্প্রদায়ের আনন্দ নয়, বরং সকলের অংশগ্রহণে এক বৃহত্তর সামাজিক মিলনমেলা।
সম্প্রতি রাজারহাট-নিউটাউন এলাকায় আয়োজিত এক প্রীতিভোজ সেই চিরন্তন বাংলারই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে। পবিত্র ঈদ এবং বাঙালির পারিবারিক উৎসব জামাইষষ্ঠীকে উপলক্ষ করে আয়োজিত এই মিলন উৎসবে একসঙ্গে বসে আহার করেছেন বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায় এবং সামাজিক পটভূমির মানুষ। দুপুরের ভোজে পরিবেশিত হয়েছে ভাত ও কাতলা মাছের কালিয়া—বাঙালির পরিচিত স্বাদের মধ্যেই যেন ধরা পড়েছে মিলনের এক সহজ অথচ গভীর বার্তা।
 
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে এলেও অনেক সময় সামাজিক দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। মতাদর্শ, পরিচয় কিংবা ধর্মীয় বিভাজনকে কেন্দ্র করে যখন নানা ধরনের বিতর্ক সামনে আসে, তখন একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া, গল্প করা কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময়ের মতো সহজ মানবিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে মুখোমুখি যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান এবং একে অপরকে জানার মধ্য দিয়ে।
 
 
সম্প্রীতির পাঠ ঈদ ও জামাইষষ্ঠীতে উৎসবের মেজাজ
 
 
ঈদ এবং জামাইষষ্ঠী—দুটি উৎসবের চরিত্র ভিন্ন হলেও তাদের মূল সুর একই। ঈদ শেখায় ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা। অন্যদিকে জামাইষষ্ঠী পারিবারিক বন্ধন, আন্তরিকতা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। যখন এই দুই উৎসবকে একই পরিসরে উদযাপন করা হয়, তখন তা কেবল একটি অনুষ্ঠান থাকে না; বরং সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে—মানুষের পরিচয়ের আগে রয়েছে তার মানবিক পরিচয়।
 
বাংলার ইতিহাসে সম্প্রীতির এই ধারা নতুন নয়। গ্রামবাংলার মেলা, পাড়ার দুর্গাপুজো, ঈদের সেমাই ভাগ করে খাওয়া কিংবা প্রতিবেশীর আনন্দে সামিল হওয়ার সংস্কৃতি বহুদিন ধরেই এই ভূখণ্ডের সামাজিক চরিত্রকে নির্মাণ করেছে। বাংলার সাহিত্য, সংগীত ও লোকসংস্কৃতিতেও সেই মিলনের সুর বারবার ফিরে এসেছে। তাই সম্প্রীতির এমন উদ্যোগ আসলে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
 
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক সম্প্রীতি কেবল বড় বড় বক্তৃতা বা নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। তার জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। যখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসে উৎসব পালন করেন, তখন পরস্পরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। ভুল ধারণা দূর হয়, বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সমাজ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
 
সম্প্রীতির বাংলায় মিষ্টিমুখ
 
রাজারহাট-নিউটাউনের এই উদ্যোগের বিশেষ তাৎপর্য এখানেই যে, এটি উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে সম্পর্কের নতুন পরিসর সৃষ্টি করেছে। শিশু, যুবক, প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে সম্প্রীতির বার্তা কখনও পুরোনো হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে তার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ে।আজ যখন সমাজের নানা স্তরে বিভেদের আলোচনা বেশি শোনা যায়, তখন এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাংলার প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে মিলন, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন উৎসব এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ যখন একই ছাতার নিচে এসে আনন্দ ভাগ করে নেন, তখনই তৈরি হয় এক সুস্থ ও মানবিক সমাজের ভিত্তি।
 
উৎসবের আসল সৌন্দর্য এখানেই—সেটি মানুষকে আলাদা করে না, কাছে টেনে আনে। আর সেই কারণেই ঈদ ও জামাইষষ্ঠীর এই মিলনমেলা কেবল একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার চিরন্তন সম্প্রীতির সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক, যা আগামী দিনেও সামাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।