‘৫ ম’ সমীকরণে বদলের ইঙ্গিত: বাংলার রাজনীতিতে ফুটলো পদ্ম,নতুন চ্যালেঞ্জে ঘাসফুল

Story by  Sudip sharma chowdhury | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 21 h ago
জয়ের মেজাজঃঝালমুড়িতে মহিলাদের বিজয় উল্লাস
জয়ের মেজাজঃঝালমুড়িতে মহিলাদের বিজয় উল্লাস
 
সুদীপ শর্মা চৌধুরী 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবার কঠিন পরীক্ষার মুখে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন । বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বহুল আলোচিত ‘৫ ম’ ফ্যাক্টর—মহিলা, মুসলিম, মাইগ্র্যান্ট (অভিবাসী), মতুয়া এবং মেশিনারি।

দীর্ঘদিন ধরে ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগানকে ভিত্তি করে রাজনীতিতে সাফল্য পেয়ে আসা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এবার সেই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি ক্রমশ নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করে বাংলায় বিকল্প শক্তি , যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মহিলা ভোটে ফাটল?

নারী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘কন্যাশ্রী’-র মতো প্রকল্প তৃণমূলের প্রতি নারীদের আস্থা তৈরি করেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। নারী নিরাপত্তা ইস্যু, বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজের আলোচিত ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা, বিরোধীদের বড় হাতিয়ার । বিজেপি এই ইস্যুকে সামনে এনে নারী ভোটে প্রভাব ফেলতে চেষ্টা করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মুসলিম ভোটে পুনর্বিন্যাস

 
 
 
 
রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার বরাবরই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২১ সালে এই ভোটব্যাঙ্কের ব্যাপক সমর্থন তৃণমূলকে বিপুল জয় এনে দেয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে ভোটের ধরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। উন্নয়ন ঘাটতি ও প্রশাসনিক অসন্তোষের কারণে কিছু ভোট অন্যদিকে সরে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি কংগ্রেসের পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা এবং অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন-এর সম্ভাব্য উপস্থিতি ভোট বিভাজনের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।

অভিবাসী ভোটার: অনিশ্চিত ফ্যাক্টর

এই নির্বাচনে অভিবাসী শ্রমিকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় বহু পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যে ফিরে এসে ভোট দিয়েছেন। ফলে ভোটের হিসাব আরও জটিল হয়েছে। এই ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল, যা ফলাফলেও প্রতিফলিত ।

মতুয়া সমর্থনে পরিবর্তন

পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১৭ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মতুয়া সম্প্রদায় গত কয়েক বছরে রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়ে প্রতিশ্রুতি ও প্রচারের মাধ্যমে বিজেপি এই সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর প্রভাব একাধিক আসনে সরাসরি পড়তে পারে।

বিজেপির শক্তিশালী মেশিনারি

 
 
 
এবারের নির্বাচনে বিজেপির সংগঠিত প্রচারযন্ত্র বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বুথস্তরের সংগঠন, ডিজিটাল প্রচার, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে দলটি কৌশলগতভাবে অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এই সংগঠন আরও সুসংহত হয়েছে, যা নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকার পরিবর্তন, আঞ্চলিক ইস্যু এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ভোটের পুনর্বিন্যাস মিলিয়ে এবারের নির্বাচন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। ‘৫ ম’ ফ্যাক্টর শুধু একটি বিশ্লেষণী কাঠামো নয়, বরং বর্তমান বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক পরিবর্তনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে।