দেবকিশোর চক্রবর্তী / কলকাতা
ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে চলমান ধর্নামঞ্চে শনিবার এক ভিন্নধর্মী মুহূর্তের সাক্ষী থাকল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর। তৃণমূল নেত্রীর ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচির মঞ্চে উঠে এক সন্ন্যাসী নিজের নাম এসআইআর তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মুখে এমন অভিযোগ শোনার পর ধর্নামঞ্চে উপস্থিত জনতার মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাঁর বক্তব্যে শুধু প্রশাসনিক ত্রুটির অভিযোগই নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও উঠে আসে।
দুপুরের দিকে ধর্নামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জী। সেই সময় উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁ এলাকার একটি 'রামকৃষ্ণ সারদা মিশন'-এর প্রেসিডেন্ট মঞ্চে এসে নিজের সমস্যার কথা জানান। মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে তিনি মঞ্চে বক্তব্য রাখেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।
সন্ন্যাসী জানান, গত ১৪ বছর ধরে তিনি মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও সম্প্রতি প্রকাশিত এসআইআর তালিকায় তাঁর নাম নেই বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি তাঁকে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন করেছে বলেও জানান।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমি রামকৃষ্ণ সারদা মিশন থেকে এসেছি। আজ ১৪ বছর হল মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট। তা সত্ত্বেও আমার নাম বাতিল করা হয়েছে। আমি বেলুড় মঠের দশম প্রেসিডেন্ট স্বামী ভিরেশ্বরনন্দা-এর মন্ত্রশিষ্য। আমি আজ দিদির কাছে এলাম। বললাম, এ রকম যদি হতে থাকে তা হলে তো দেশের অবস্থা খুব খারাপ হবে।”
তাঁর এই বক্তব্যে ধর্নামঞ্চে উপস্থিত জনতার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সন্ন্যাসী আরও বলেন, যদি এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে কোনও বিভ্রান্তি বা অবিচার থাকা উচিত নয়।
ধর্মীয় সন্ন্যাসীর বক্তব্যে সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ না থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, “ধর্নামঞ্চ থেকে বলব, সত্যের জয় হোক। এসআইআর যাতে উঠে যায়, তার জন্য ঠাকুর-মা-স্বামীজির কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি।” তাঁর বক্তব্যে আধ্যাত্মিকতার সুর যেমন ছিল, তেমনই ছিল নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও।
এই ঘটনার পর ধর্নামঞ্চে উপস্থিত অনেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, একজন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নাম যদি তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা ঘটতে পারে।
মিনাখাঁ এলাকার এই মিশন দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবা, শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক নানা কাজে যুক্ত। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের এমন অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে চলমান এই ধর্না ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ সেখানে এসে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরছেন। তারই মধ্যে এক সন্ন্যাসীর এমন বক্তব্য এই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
দিনের শেষে তাঁর বক্তব্যে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা মূলত ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান। রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি আধ্যাত্মিক ভাষায় প্রার্থনা করেছেন, সত্য যেন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষের ন্যায্য অধিকার যেন সুরক্ষিত থাকে। তাঁর কথায়, “সত্যের জয় হবেই”- এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন।