কলকাতা
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড আজ সাক্ষী থাকল বাংলার রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের। বিপুল জনসমাগম, গেরুয়া আবহ এবং বাঙালিয়ানার সাংস্কৃতিক ছোঁয়ার মধ্যে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল আর এন রবি।
গেরুয়া পোশাকে মঞ্চে উঠে শুভেন্দুর শপথগ্রহণ ঘিরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে উপস্থিত জনতা। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ব্রিগেড চত্বর। মঞ্চসজ্জাতেও ছিল বিশেষ বার্তা, একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর প্রতিকৃতি, অন্যদিকে দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও দেবী দুর্গার ছবির কোলাজ।
শুধু রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, এ যেন ছিল এক সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাও। কীর্তন, ছৌ নাচ, বাউল গান এবং ধামসা-মাদলের তালে তালে উৎসবের রূপ নেয় গোটা ব্রিগেড। বাংলার লোকসংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পালাবদলের আবহ একসঙ্গে মিশে যায় অনুষ্ঠানে।
নতুন মন্ত্রিসভায় শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল, নিশীথ প্রামাণিক-সহ একাধিক নেতা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ বহু ভিভিআইপি অতিথি। বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন শিলিগুড়ির প্রবীণ স্বাধীনতা-চেতনার ধারক মাখনলাল সরকার। দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার কারণে একসময় যাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল তৎকালীন কংগ্রেস সরকার, সেই মাখনলাল সরকারকে এদিন মঞ্চে সংবর্ধনা জানান মোদি। এমনকি তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেও দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান শুধুমাত্র ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। নন্দীগ্রাম আন্দোলন-এর অন্যতম মুখ হিসেবে তিনি রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। সেই আন্দোলনই একসময় বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নড়িয়ে দেয়। পরে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে পরাজিত করে জাতীয় স্তরেও আলোচনায় উঠে আসেন শুভেন্দু।
এবারের নির্বাচনে ভবানীপুর থেকেও প্রার্থী হয়ে তিনি সরাসরি মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানান। ফলাফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। ২০৭টি আসন জিতে প্রথমবার বাংলার ক্ষমতায় আসে বিজেপি। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারীই।
পূর্ব মেদিনীপুরের মাটি বরাবরই আন্দোলনের ইতিহাস বহন করে এসেছে। ব্রিটিশ আমলে এখান থেকেই গড়ে উঠেছিল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার। দেশপ্রাণ শাঁসমল ও মাতঙ্গিনী হাজরা-র আত্মত্যাগের সেই মাটি থেকেই এবার বাংলার প্রশাসনিক নেতৃত্বে উঠে এলেন শুভেন্দু।
একসময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা বরাবর কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল এবং জেলার নেতারা উপেক্ষিত হতেন। এবার জেলা থেকেই রাজ্য পরিচালনার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, শপথগ্রহণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যেন তারই বাস্তব রূপ পেল বাংলা।