দেবকিশোর চক্রবর্তী
বঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনীতির ময়দানে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—একাধিক জনসভায় তাঁর উপস্থিতি যেন আলাদা করে চোখে পড়ছে। মঞ্চে উঠলেই ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে স্লোগান—“মামা, মামা!” এই ডাকেই যেন তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত আত্মীয়তার আবহ। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেই তাঁর বক্তব্য ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিতর্কও।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এল ভিন্ন ভিন্ন মত।“খুব সহজভাবে কথা বলেন”—সমর্থকদের উচ্ছ্বাস।কলকাতার বাসিন্দা ও বিজেপি সমর্থক অরিজিৎ দাস বললেন,“হিমন্তজি অন্যরকম নেতা। উনি খুব সহজ ভাষায় কথা বলেন, মনে হয় যেন আমাদের বাড়ির লোক কথা বলছে। ‘মামা’ বলে ডাকাটাও সেখান থেকেই এসেছে। উনি যেটা ভাবেন, সেটাই সরাসরি বলেন—এই স্পষ্টতাই মানুষকে টানছে।”
মালদহের সুমন সরকারের কথায়,“বাংলার অনেক নেতা ঘুরিয়ে কথা বলেন, কিন্তু উনি সরাসরি কথা বলেন। তাই মানুষ ওনাকে শুনতে চাইছে। জনসভায় যে ভিড় হচ্ছে, সেটাই প্রমাণ।”“এই ভাষা ঠিক নয়”—সমালোচনার সুরও স্পষ্ট।তবে সবাই যে এই আবেগে ভাসছেন, তা নয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিক্ষিকা মধুমিতা চক্রবর্তী কিছুটা উদ্বেগের সুরে বললেন,“রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু যেভাবে ধর্মের ভিত্তিতে কথা বলা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। এতে মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। ভোটের সময় এই ধরনের ভাষণ আরও সমস্যা তৈরি করতে পারে।”
কলকাতার কলেজ পড়ুয়া সায়ন ঘোষের মত,‘মামা’ বলে ডাকাটা একটা মজার বিষয়, কিন্তু তার আড়ালে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, সেটা ভাবার মতো। আমরা চাই উন্নয়নের কথা, কাজের কথা—শুধু বিভাজনের রাজনীতি নয়।”বিশ্লেষকের চোখে—“আবেগ ও কৌশলের মিশেল”রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক সরোজ চক্রবর্তী মনে করেন,
“হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খুব দক্ষ বক্তা। তিনি জানেন কীভাবে মানুষের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরি করতে হয়। ‘মামা’ ইমেজটা সেই কারণেই কাজ করছে—এতে একটা কাছের মানুষের অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে যে মেরুকরণের সুর রয়েছে, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। এই দুইয়ের মিশেলই তাঁর প্রচারকে প্রভাবশালী করে তুলছে।”
“শান্তিই সবচেয়ে জরুরি”—সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।হাওড়ার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বললেন,“রাজনীতি যদি মানুষকে ভাগ করে দেয়, তাহলে সেটা ভালো নয়। আমরা চাই সবাই মিলেমিশে থাকুক। ভোট আসবে যাবে, কিন্তু সম্পর্কটা যেন নষ্ট না হয়।”নদিয়ার গৃহবধূ পাপিয়া মণ্ডলের সহজ কথা,“আমরা খুব বড় বড় কথা বুঝি না। শুধু চাই শান্তি থাকুক। যদি কারও কথায় অশান্তি বাড়ে, তাহলে সেটা ভালো নয়।”
সব মিলিয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রচার বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে এক আলাদা রং এনেছে। তাঁর সহজ ভাষা, রসিকতা আর ‘মামা’ ইমেজ যেমন অনেককে আকৃষ্ট করছে, তেমনই তাঁর বক্তব্যের মেরুকরণমূলক দিক নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়াই দেখিয়ে দিচ্ছে—তিনি যেমন জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন, তেমনই বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছেন। এখন দেখার, ভোটের বাক্সে এই প্রভাব কতটা প্রতিফলিত হয়।