তুমি রবে নীরবে: জন্মদিনে শিল্পীকে ছাপিয়ে ওঠা মানবতার প্রতীক জুবিন গার্গ

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 d ago
তুমি রবে নীরবে: জন্মদিনে শিল্পীকে ছাপিয়ে ওঠা মানবতার প্রতীক জুবিন গার্গ
তুমি রবে নীরবে: জন্মদিনে শিল্পীকে ছাপিয়ে ওঠা মানবতার প্রতীক জুবিন গার্গ
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

৫৩তম জন্মদিনে তিনি নেই—তবুও তাঁর কণ্ঠ, তাঁর সুর, তাঁর মানবতার দীপ্তি আজ আরও তীব্র, আরও স্পষ্ট। যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “আমার কোনো জাতি নেই, ধর্ম নেই, ভগবান নেই—আমিই কাঞ্চনজঙ্ঘা,” সেই জুবিন গার্গ আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোকরেখা আমাদের ভেতরেই আজ নতুন করে তাকে চিনিয়ে দেয়।

অসমিয়া, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি—চার ভাষায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ৪০ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করা এক বহুমাত্রিক শিল্পী। কিন্তু শিল্পীর পরিচয় তাঁকে যতটুকু অমর করেছে—তার চাইতেও গভীর ছাপ রেখে গেছে তাঁর সহানুভূতি, তাঁর মানবিক সত্তা। তাই জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ মানে শুধু গায়ক নয়—মানুষ জুবিনকে ফিরে দেখা।

করোনার দিনে একক যোদ্ধা—নিজের বাড়িকে মানুষের আশ্রয় করে তোলা: ২০২০-এর মহামারির আতঙ্কে যখন অসংখ্য মানুষ ঘরে নিজেকে সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত, তখন জুবিন গার্গ নিজের বাড়ির দরজা খুলে দিলেন অসহায়দের জন্য। নিজের অর্থে, নিজের দায়িত্বে, এমনকি নিজের ঝুঁকিতে তিনি তৈরি করলেন একটি পূর্ণাঙ্গ COVID কেয়ার সেন্টার—অক্সিজেন, ওষুধ, খাবার, চিকিৎসা—সবকিছুর ব্যবস্থা নিজ হাতে।

অন্যরা যখন দূরত্বে সুরক্ষিত, তখন তিনি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে গেলেন সামনে। শিল্পী থেকে মানবদূত—জুবিন গার্গ সেই রূপান্তরের উজ্জ্বল উদাহরণ।

রক্তের নয়—হৃদয়ের সম্পর্ক: ১৫ সন্তান তাঁর স্বপ্নের পরিবার:


জুবিন ও তাঁর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গর্গের নিজের সন্তান না থাকলেও তাঁদের ঘর আশ্রয় দিয়েছে ১৫ জন দত্তক সন্তানকে। কাগজে-কলমে দত্তক নয়—প্রতিটি শিশুর খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর দায়িত্ব তাঁরা নিয়েছিলেন পূর্ণ ভালোবাসা ও যত্নে।

তাঁদের বাড়িই ছিল ছোটদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্কুল, পরিবার। জুবিন প্রায়ই বলতেন, “যে শিশুকে বাঁচাতে পারি—সেই আমার সন্তান।”
খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এমন মানবিক মহিমা খুব কম শিল্পীর জীবনে দেখা যায়।

এক নির্যাতিতা থেকে স্নেহের কন্যা—কাজলির গল্প:
 
জুবিন গার্গ
 
এই ১৫ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বিশেষ ছিল কাজলি।একদিন কাজ থেকে ফেরার পথে জুবিন দেখেন—এক কিশোরীকে রাস্তায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি কোনো দ্বিধা না করে শিশুটিকে উদ্ধার করেন, মামলা করেন, লড়াই করেন এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হন।
কাজলিকে দত্তক নিয়ে বড় করেন নিজের কন্যার মতো—যেন ভালোবাসা আর ন্যায়বোধের নিজের জীবন্ত প্রতীক।

এই গল্প শুধু দয়া নয়—জুবিনের সাহস, দৃঢ়তা এবং অটল মানুষিকতার প্রতিচ্ছবি।


বন্যার জলে ভাসা অসম—আর সহানুভূতির নৌকা বেয়ে চলা জুবিন:


প্রতিবছর বন্যায় অসমের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আর সেই দুর্যোগে প্রথম সারিতে দেখা যেত জুবিনকে—
কখনো কলাগুরু আর্টিস্ট ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে, কখনো একা।তাঁর হাতে পৌঁছে যেত খাবার, ত্রাণ, ওষুধ—কোনো আড়ম্বর নয়, কোনো প্রচারের প্রয়োজন নেই।মানুষ তাঁর কাছে ছিলই প্রথম।


ধর্ম-রাজনীতির বিভাজন ভেঙে—মানুষকে মানুষের মতো দেখার শিক্ষা: জুবিন কখনো কোনো রাজনৈতিক শিবিরে বাঁধা পড়েননি। ধর্ম-বিভেদের কাছে মাথা নত করেননি।তাঁর কনসার্ট ছিল এক অদ্ভুত মিলনমেলা—ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলিম, তরুণ-বৃদ্ধ—সবাই একসাথে গাইছে, নাচছে, উৎসব করছে।সঙ্গীত তাঁর কাছে ছিল মানবতার ভাষা—বিভেদের দেয়াল ভেঙে একসাথে দাঁড়াবার শক্তি।
 

 
জুবিন গার্গ
 
অসঙ্গত বিদায়—অসম থেকে মুম্বই, সর্বত্র শোকের ছায়া

সিঙ্গাপুরে গিয়ে মাত্র ৫২ বছরের কম বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু—অসম থেকে মুম্বই, কলকাতা—সব শিল্পমহলে এনে দেয় গভীর শোকের ছায়া।
 
“ইয়া আলি”, “পিয়া রে পিয়া রে”, “মরম জনম”—তাঁর অগণিত গানের মতো তাঁর স্মৃতিও আজ অমর।কিন্তু যিনি সেই সুরের মানুষটিকে মানবতার আলোকবর্তিকায় পরিণত করেছিলেন—তিনি আর ফিরবেন না।

জুবিন গার্গ ছিলেন অসমের মাটির গন্ধ মাখা এক সাধারণ অথচ মহিমান্বিত মানুষ—যাঁর গানে নেচেছে আট থেকে আশি,
যার হৃদয়ের মমতায় আশ্রয় পেয়েছে অগণিত জীবন।

তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার সেরা উপায় একটাই—শিল্পীর প্রতিভার সামনে নয়,মানুষ জুবিন গার্গের মানবতার সামনে মাথা নত করা।