অরিজিতের গিটারে কেন লেখা থাকে ‘ঝিলিক-ঝোরা-মিঠি’? কাদের নাম কাঁধে বয়ে বেড়ান গায়ক?
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ভারতের শ্রেষ্ঠ গায়কদের তালিকা তৈরি হলে প্রথম সারিতেই থাকবেন অরিজিৎ সিং। প্রেম, বেদনা, উদ্দাম পার্টি—সব ঘরানাতেই তাঁর গানের আবেদন তুলনাহীন। কনসার্টে লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হওয়া আজ রোজকার বিষয়। এত জনপ্রিয়তার মাঝেও গায়ক যেন একই সঙ্গে রহস্যময়। বিশেষ করে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র—গিটার। ভক্তদের চোখে পড়ে, তাঁর গিটারে বারবার ফুটে ওঠে কিছু নাম—ঝিলিক, ঝোরা, মিঠি। কারা এরা? কেনই বা এই নামই খোদাই থাকে তাঁর গিটারের গায়ে?
গায়ক নিজে কখনও এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। এমনকি তাঁর গিটারিস্ট বা দলের অন্য সদস্যরাও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তবে গায়কের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে, অরিজিৎ নাকি নিজের প্রতিটি অ্যাকোয়াস্টিক গিটারের আলাদা নাম রাখেন। ভালোবেসে, নিজের মতো করে। আর সেই নামগুলোই খোদাই করে রাখেন গিটারের গায়ে। আর সেটাও নিজের হাতে লিখে। মার্কার বা সেই জাতীয় কলমে গিটারের গায়ে বাংলায় গোটা গোটা হরফে তিনি লেখেন নাম, অর্থাৎ প্রতিটি অ্যাকোয়াস্টিক গিটারের আলাদা আলাদা নামকরণ করেন গায়ক স্বয়ং। কিন্তু কোন গিটারের নাম কেন রাখলেন ‘ঝিলিক’, ‘ঝোরা’, ‘মিঠি’—তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
কী অদ্ভুত বৈপরীত্য—স্টেজে তিনি কোটি ভক্তের মাঝখানে এক তারকা, আর মঞ্চের বাইরে জিয়াগঞ্জের ‘সোমু’, একেবারে ঘরের ছেলে। জন্ম ও বড় হওয়া মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে; আজও সেখানে সাধারণ মানুষের মতোই থাকার আনন্দ নেন তিনি। কখনও স্কুটার নিয়ে, কখনও হাঁটতে হাঁটতেই হাট-বাজারে চলে যান। ছেলেদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে স্কুটারে ঘুরে বেড়ানো—সবকিছুই তাঁর জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
মঞ্চে তাঁর একবার ওঠাই যথেষ্ট—ভিড় হতে থাকে ঢেউয়ের পর ঢেউ। ইকোনমি ক্লাসের বিমানে কিংবা ট্রেনের স্লিপারে তাঁকে অন্য যাত্রীর মতোই দেখা যায়। না পোশাকের জাঁকজমক, না নিরাপত্তার ভারী বলয়—অরিজিত সিং যেন নিজের নিজস্ব ছন্দেই চলেন। জনপ্রিয়তা তাকে বদলাতে পারেনি, বরং আরও মাটির মানুষ করে তুলেছে।
জন্মদিনে ঝলমলে পার্টি নয়, বরং নিজের প্রতিষ্ঠিত সমাজকল্যাণমূলক হোটেলে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের জন্য আয়োজন করেন পংক্তিভোজনের। গানের সাফল্য যতই বাড়ুক, তাঁর জীবনযাপন এখনও সহজ-সরল, প্রায় লাজুক।
আর সেই সরলতার প্রতিফলন কি লুকিয়ে আছে তাঁর গিটারগুলির নামের মধ্যেও? হয়তো ‘ঝিলিক’, ‘ঝোরা’, ‘মিঠি’—কোনো প্রিয় স্মৃতি, অনুভূতি বা মুহূর্তের নাম। হয়তো শুধুই নিজের মনের মতো রাখা কিছু স্নেহের নাম।
যাই হোক, ভক্তদের কাছে এগুলো হয়ে উঠেছে অরিজিত সিংয়ের এক নীরব কিন্তু গভীর ব্যক্তিগত স্বাক্ষর—গানের বাইরে তাঁর সত্তার একটি কোমল, মানবিক অধ্যায়।