জাতীয় পুরস্কারের গৌরবে সম্পর্কের নীরব সুর — অর্জুন দত্তের ‘ডিপ ফ্রিজ’

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 Months ago
অর্জুন দত্তের ‘ডিপ ফ্রিজ’
অর্জুন দত্তের ‘ডিপ ফ্রিজ’
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

জাতীয় পুরস্কারের মুকুট পরে অর্জুন দত্ত তাঁর নিজস্ব আবেগী সুরে ফিরলেন ‘ডিপ ফ্রিজ’–এর মাধ্যমে। আধুনিক সম্পর্কের ভাঙন, অপূর্ণতা, অভিমান ও অনুচ্চারিত ভালোবাসার স্তরগুলোকে এই ছবিতে তিনি যে সংবেদনশীলতা দিয়ে তুলে ধরেছেন, তা এককথায় উল্লেখযোগ্য। গল্প দু’লাইনের হলেও তার ভিতরকার অভিঘাত অনেক গভীর—এমনই এক চলচ্চিত্র-ভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি।

ছবির শক্তি তার চিত্রনাট্য ও সংলাপে। অর্জুন দত্ত, আশীর্বাদ মৈত্র ও আত্মদীপের লেখা সংলাপগুলো উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং নিঃশব্দে চলা যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি। সম্পর্ক কি সত্যিই ভেঙে যায়, নাকি বরফের স্তর জমে থাকা স্মৃতির মাঝে চাপা পড়ে থাকে?—এই প্রশ্ন ছবিটি জুড়ে রয়ে যায়।

সুপ্রতিম ভোলের লিরিকাল সিনেমাটোগ্রাফি ছবিকে অন্য মাত্রা দেয়। বৃষ্টি এখানে কেবল প্রাকৃতিক আবহ নয়, বরং গল্পের তৃতীয় চরিত্র—অভিমানের অবিরাম ঝরনা, স্মৃতির ঘন মেঘ, আর বাধ্যতামূলক মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভার। সুজয় দত্ত রায়ের সম্পাদনায় ফ্ল্যাশব্যাকের প্রবেশ-প্রস্থান এতটাই মসৃণ যে পুরো ছবিটি যেন একটি দীর্ঘ কবিতা হয়ে ওঠে।

স্বর্ণাভ ও মিলির সম্পর্কের ভাঙন গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। আবির চট্টোপাধ্যায় স্বর্ণাভর অসহায়তা, অপরাধবোধ, টলমল ভালবাসাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তনুশ্রী চক্রবর্তী মিলির ভূমিকায় স্থির, সংযত, আর গভীর। একরাতের মুখোমুখিতে তাঁদের অতীতের সুখস্মৃতি আর বর্তমানের যন্ত্রণা পাশাপাশি চলে—প্রশ্ন তোলে, “একটা ভুল কি ক্ষমার যোগ্য নয়?” কিন্তু ভুল যদি জীবনের অংশ হয়ে যায়, তবে সেই ক্ষমার বাস্তবতা কোথায়?

এইখানেই ‘ডিপ ফ্রিজ’ আজকের সময়ের ছবি। এখানে সম্পর্ক ভাঙলেও মর্যাদা থাকে, দূরত্ব থাকলেও সম্মান থাকে। ঠিক-ভুলের সোজা বয়ান নেই—বরং জীবনকে যেমন, তেমনভাবেই দেখা হয়।

অনুরাধা মুখোপাধ্যায়ের রঞ্জা চরিত্রটি ছবিতে এনে দিয়েছে এক উজ্জ্বল বাস্তবতা। শোয়েব কবীরের তাতাই চরিত্রও মন কাড়ে। সৌম্য ঋতের সঙ্গীত—বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত ও “আমরা দু’জন ঘর ভেঙেছি কোন সুখে”—ছবির আবেগকে আরও উচ্চতর করে।

যদিও কিছু অংশে পুনরাবৃত্তি বা শেষের পূর্বানুমেয়তার অভিযোগ উঠতে পারে, তবে ছবির আবেগিক পরিসর এই সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যায়। বরফ গলে গেলেই যে সম্পর্ক আগের মতো হয় না, আবার নতুন করে শুরু হওয়ার পথও খুলে যায়—এই উপলব্ধিই ‘ডিপ ফ্রিজ’–এর মূল সুর।

জাতীয় পুরস্কারের পর দর্শকের প্রত্যাশা ছিল উঁচু—অর্জুন দত্ত সেই প্রত্যাশাকে সম্মানিত করেছেন। নীরব, স্নিগ্ধ, সম্পর্কের ভাঙন-পুনর্গঠনের গভীর অনুভবময় এই ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দর্শককে নিশ্চিতভাবেই নিরাশ করবে না।