কলকাতা ঃ
চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা ঋত্বিক কুমার ঘটকের জন্মশতবার্ষিকী আজ উদযাপিত হবে।দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে। ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে ঘটকের স্থান সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের সমান।
৪ নভেম্বর জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হবে বাংলা তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটকের। ‘অযান্ত্রিক’-এর স্রষ্টাকে নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আয়োজন। পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা। অথচ সেই মহান স্রষ্টার বাংলাদেশের রাজশাহীর পৈতৃক বাড়ি আজও ধ্বংসস্তূপ! গত বছর ভগ্নপ্রায় বাড়িটিতে ভাঙচুর চালায় একদল দুষ্কৃতী। এমনিতেই দেয়ালে বয়সের গভীর দাগ, ঘরজুড়ে আগাছার রাজত্ব। সময়ের ধুলোয় মিশে থাকা স্মৃতির গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন এক নিঃসঙ্গ শোকগাথা। যাকে নিয়ে গর্বিত হওয়ার কথা বাঙালির, তাঁর শৈশব-যৌবনের আশ্রয়স্থল আজ অবহেলার অন্ধকারে নিমজ্জিত।
বাংলা একাডেমি আজ বিকেল ৪টায় একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করবে।এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ এবং বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম যৌথভাবে বিকেল ৫টায় ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ঋত্বিক ঘটক। ভারতের বিভাজনের পর তিনি ও তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যান। ১৯৫৮ সালে তিনি বেহরামপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ কোর্সে ভর্তি হলেও তা শেষ করেননি, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল লেখালেখি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে বেশি অর্থবহ।
‘নবান্ন’ নামের নাটক প্রকাশের মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটক খ্যাতি অর্জন করেন।১৯৫১ সালে তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। পরের বছর তিনি ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ‘দলিল’ নামে একটি নাট্য প্রযোজনা করেন, যা ১৯৫৩ সালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৫৫ সালে তিনি ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামে একটি নাট্যদল গঠন করেন এবং ‘সাঁকো’ নাটকটি মঞ্চস্থ করেন।
ঘটকের প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ছিল ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮)। এটি ছিল ভারতের অন্যতম প্রথম চলচ্চিত্র, যেখানে একটি জড় বস্তু—একটি গাড়ি—গল্পের চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাঁর প্রথম বাণিজ্যিক সাফল্য আসে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মধুমতী’ (বিমল রায় পরিচালিত) দিয়ে, যা পুনর্জন্মের থিম নিয়ে নির্মিত প্রথম দিকের একটি চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা গল্পের স্বীকৃতি পান।
ঋত্বিক ঘটক আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’তে এক শরণার্থী পরিবারের সংগ্রামী জীবনের কাহিনি ফুটে উঠেছে। পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নেয় এবং আত্মত্যাগের সব সীমা অতিক্রম করে।
‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ চলচ্চিত্রে তিনি এক পালিয়ে যাওয়া ছেলের চোখ দিয়ে কলকাতা শহরকে দেখিয়েছেন। ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রে তিনি নিজের জীবন ও দর্শন প্রতিফলিত করেছেন। তাঁর নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের রেটিং অনুযায়ী সেরা দশ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ছিল আত্মজীবনীমূলক ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪)।
ঋত্বিক ঘটক বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আদিবাসীস, সিজর্স, ফিয়ার, রঁদেভ্যু সিভিল ডিফেন্স, সায়েন্টিস্ট অব টুমরো, আমার লেনিন এবং পুরুলিয়ার ছাউ।
এই চলচ্চিত্রকার ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পরলোকগমন করেন।