পুজোমণ্ডপে ঢুকলেই ফিরবে ছোটবেলা! উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিতের জাদুতে বালুরঘাটের কবিতীর্থে মিলবে শৈশবে ফেরার টিকিট

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
পুজোমণ্ডপে ঢুকলেই ফিরবে ছোটবেলা! উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিতের জাদুতে বালুরঘাটের কবিতীর্থে মিলবে শৈশবে ফেরার টিকিট
পুজোমণ্ডপে ঢুকলেই ফিরবে ছোটবেলা! উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিতের জাদুতে বালুরঘাটের কবিতীর্থে মিলবে শৈশবে ফেরার টিকিট
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

পুজোর এবার উপেন্দ্রকিশোরের কল্পনার জগতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার সুকুমার রায়ের অপার আনন্দের ছন্দ। আর তাদেরই উত্তরসূরি সত্যজিৎ রায়ও ধরা দেবেন এখানে। তিন প্রজন্ম, তিন রকমের সৃষ্টি, অথচ কোথাও সকলের শিল্পচর্চা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আপামর বাঙালির শৈশব, কৈশোর, কল্পনা আর নস্টালজিয়া যে সুতোয় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে। এবার দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের দুর্গাপুজোয় সেই তিন প্রজন্মকেই এক ছাদের নীচে আনতে চলেছে কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাব। ৬১তম বর্ষে তাদের পুজোর থিম ‘তিন পুরুষ’।
 
উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পুজোমণ্ডপে ঢুকলে মনে পড়ে যেতে পারে ছোটবেলার বইয়ের পাতায় চোখ ডুবিয়ে থাকার দিন। স্মৃতিপটে ভেসে উঠবে সেই গল্পগুলো বা আজগুবি ছড়ায় হেসে গড়িয়ে পড়া, কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট চরিত্রদের দেখে বিস্ময়ে চেয়ে থাকার মুহূর্ত। কবিতীর্থের থিমে এ বারের ভাবনা সত্যিই অন্যরকম। বলা ভালো, এ যেন স্মৃতির অলিগলি দিয়ে ফিরে যাওয়ার এক আমন্ত্রণ।
 
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের দুর্গাপুজো
 
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে রায় পরিবারের এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে একের পর এক সৃষ্টির কথা। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যাঁর লেখনী, চিত্রাঙ্কন ও মুদ্রণশিল্পের দক্ষতা স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিল বাংলা প্রকাশনা জগতে। শিশুসাহিত্যের যে জগৎ সমৃদ্ধ হয়েছিল তাঁর হাত ধরে, পরবর্তী প্রজন্মে সুকুমার রায় সেই জগতেই কল্পনার এক আশ্চর্য রসায়ন যোগ করেছিলেন। এতবছর পরও আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে ‘আবোল তাবোল’-এর ছন্দ আর ‘হযবরল’-এর উদ্ভট কাণ্ডকারখানা।
 
এর পরের অধ্যায়ে সত্যজিৎ রায় আনলেন নিজস্ব ঘরানা। সাহিত্য, অলঙ্করণ ও সৃজনশীলতার উত্তরাধিকারকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের বৃহত্তর জগতে। তাঁর পরিচালনায় ছবির ভাষা, চরিত্র নির্মাণ থেকে গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গি বাংলা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে। সেই কথা স্মরণ করে বাংলার এই তিন স্রষ্টাকে পুজোমণ্ডপে তুলে ধরতে চেয়েছে কবিতীর্থ। এখানে তিন প্রজন্মের পরিচয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে থাকা যোগসূত্র। এক প্রজন্ম বুনেছিল কল্পনার বীজ, পরের প্রজন্ম তাকে দিয়েছে নতুন ভাষা।  আর তৃতীয় প্রজন্ম সেই সৃষ্টিশীলতাকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক শিল্পমাধ্যমে। যা বাঙালীর মনে গেঁথে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে। 
 
কবিতীর্থের এ বছরের থিমে রয়েছে আরও একটি বিশেষ তাৎপর্য। সত্যজিৎ রায়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী এবং সুকুমার রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘হযবরল’-এর ১০৫ বছর পূর্তিকে ঘিরে রায় পরিবারের সৃষ্টিজগৎ নতুন করে আলোচনায় আসছে। প্রায় ১৬০ বছরের শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতাকেও ভাবনায় রেখেছেন উদ্যোক্তারা। মনে করা হচ্ছে, এই থিমের গভীরে রয়েছে এমন এক আবেগ, যা বয়সের সীমারেখা মানে না। যাঁরা একসময় ‘সন্দেশ’-এর পাতায় গল্প পড়েছেন,  এই মণ্ডপে এলে তাঁরা হয়ত ফিরে যেতে পারবেন ছেলেবেলার দিনগুলিতে। আর এই থিমের ভাবনা উপলব্ধি করতে পারলে নতুন প্রজন্মের কাছে খুলে দিতে পারে এক সৃষ্টির জগৎ। যে জগতের সঙ্গে পরিচয় হওয়া মানে বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের শিকড়কে নতুন করে চেনা।
 
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের দুর্গাপুজো
 
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, পুজোমণ্ডপের বিভিন্ন অংশে তুলে ধরা হচ্ছে তিন প্রজন্মের সাহিত্যকর্ম, অলঙ্করণ, শিল্পচর্চা সহ চলচ্চিত্র নির্মাণের নানা দিক। তবে সাবেকি প্রতিমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হবে এই থিমের মণ্ডপ। থিমের সঙ্গে মিলিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে বিশেষ আলোকসজ্জার। ফলে দর্শনার্থীরা দেবীদর্শনের পাশাপাশি রায় পরিবারের সৃষ্টির জগতের মধ্যেও ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাবেন।
 
জানা গেছে, বালুরঘাটের কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের এ বারের পুজোর বাজেট প্রায় সাত লক্ষ টাকা। থিমের পরিকল্পনায় রয়েছেন কালিয়াগঞ্জের প্রখ্যাত শিল্পী নন্দকুমার ঘোষ। তাঁর লক্ষ্য, রায় পরিবারের সাহিত্য ও সিনেমার স্মৃতিকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে মন্ডপে আসা দর্শনার্থীরা অবাক হয়ে শুধু দেখবেন না অনুভবও করবেন এই শিল্প। ক্লাবের সম্পাদক প্রণবেশ কুণ্ডু জানালেন,  ৬১তম বর্ষে পা দিয়েছে তাদের পুজো। গত বছর কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের উদ্যোগে আয়োজিত সংসদ সম্মান প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল ক্লাবটি। তাঁদের ভিন্ন চিন্তা ভাবনার ফসল হিসেবে অন্যান্য জায়গা থেকেও পুরস্কার এসেছে।
 
 
এ বারও তিন পুরুষের ভাবনা দর্শকদের ভালো লাগবে বলে আশাবাদী উদ্যোক্তারা। শুধু অভিনব থিম ভাবনাই নয়, অষ্টমীতে দরিদ্র মানুষের জন্য আর নবমীতে এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে মহাভোগের ব্যবস্থা করবে পুজো উদ্যোক্তারা। অর্থাৎ, নস্টালজিয়ার পাশাপাশি পুজোর সামাজিক বন্ধনকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। থিমশিল্পী নন্দকুমার ঘোষের ভাবনায় এ বার রায় পরিবারের রচনা থেকে সিনেমা সৃষ্টির নানা দিককে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা যে দর্শনার্থীদের নস্টালজিয়ার জগতে নিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে আশাবাদী সকলেই।
 

তাই বলাই যাই কবিতীর্থের ‘তিন পুরুষ’ থিমে এ বার হয়তো কেউ খুঁজবেন নিজের শৈশব, কেউ আবিষ্কার করবেন নতুন কোনও গল্পের দরজা, আবার কেউ ফিরে পাবেন পরিবারের সঙ্গে কাটানো পুরনো দিনের স্মৃতি। শিল্পচর্চা কখনও মুছে যায় না, থেকে যায় মনের গভীরে, যা বারবার ফিরে আসে সৃষ্টির হাত ধরে।


শেহতীয়া খবৰ