একই পুজোর আসরে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বাঁধন! বিনসিরার ৭৭ বছরের দুর্গোৎসবে আজও বেঁচে সম্প্রীতির সেই স্মৃতিগুলো
তরুণ নন্দী / কলকাতা
কয়েক দশক পেছনে ফিরলে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই দিনগুলোর কথা। একসময় ছিল ঢাকের বাদ্যি, যাত্রাপালার আসর আর উৎসবের আবহে মিশে যেত দুই সম্প্রদায়ের মানুষের আনন্দ। সীমান্ত লাগোয়া প্রান্তিক এই গ্রামে হিন্দুদের দুর্গাপুজোয় শামিল হতেন মুসলিম পরিবারের মানুষজনও। পুজোর আনন্দে সকলে মেতে উঠতেই ধর্মের পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠত মানুষের সঙ্গে মানুষের টান। অথচ আজ সেই ছবিটা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলির বিনসিরা গ্রামে ৭৭ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো আজও ভোলে নি সেই অতীতের স্মৃতি। রয়ে গিয়েছে পুজোর দালান, রয়ে গিয়েছে ঐতিহ্য, পুজো এখনও হয় বটে, তবে হারিয়ে গিয়েছে একসঙ্গে উৎসব করার সেই চেনা আবহ। হিলির বিনসিরা গ্রামের ৭৭ বছরের লাহা পরিবারের দুর্গাপুজো সম্প্রীতির সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি আজও বয়ে নিয়ে চলেছে।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলির বিনসিরা গ্রামে ৭৭ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো
আসলে সময় বদলেছে, গ্রামের জনবিন্যাসও বদলেছে। এলাকার বহু মুসলিম পরিবার পেশার তাগিদ অন্যত্র চলে যাওয়ায় পুজোর আসরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের একসঙ্গে আনন্দ করার সেই পুরনো দৃশ্য তেমনভাবে আর দেখা যায় না। তবু বিনসিরার পুজোর ইতিহাসে সম্প্রীতির সেই দিনগুলো আজও পরিবারের কাছে অমলিন।
বিনসিরার বনেদি লাহা পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। পরিবার সূত্রে জানা যায়, একসময় এই পরিবারের পদবি ছিল সাহা। পরিবারের সদস্যদের কথায়, স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে পুরনো দুর্গাপুজো দুটি ভাগে বিভক্ত হয় পারিবারিক কারণে। এরপর তিনকরী সাহা, শ্রীবাস সাহা, প্রাণকৃষ্ণ সাহা ও শ্রীকৃষ্ণ সাহা চার ভাই মিলে বাড়ির পাশের ‘লক্ষ্মীর দালান’-এ নতুন করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। সেই পুজোই পুরোনো প্রথা মেনে আজও ৭৭ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে।
এই ‘লক্ষ্মীর দালান’ তৈরির পিছনেও রয়েছে এক কাহিনি। কথিত আ ছে, ১৩৩৮ বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে যান বঙ্গাব্দে হেমন্ত কুমার লাহা। তাঁকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিবারের বড়রা তখন মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করেন, তাঁরা একটি মন্দির তৈরি করবেন হেমন্তবাবু সুস্থ হয়ে উঠলে। পরবর্তীতে প্রাণে বেঁচে যান হেমন্তবাবু। পরিবারের তরফে সেই মানত পূরণ করে তৈরি করা হয়েছিল মা লক্ষ্মীর মন্দির। স্থানীয় মানুষের কাছে ‘লক্ষ্মীর দালান’ নামে পরিচিত এই মন্দির। পরবর্তী সময়ে সেই দালানেই শুরু হয় দুর্গাপুজো।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলির বিনসিরা গ্রাম
লাহা পরিবারের বর্তমান বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ফণীন্দ্রনাথ লাহার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল উঠল পুরোনো দিনগুলি। তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে এল, পুজোর উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি জানান, পুজোদিনগুলোতে উৎসাহ নিয়ে গ্রামের সকল ধর্মের মানুষ একত্রিত হতেন। বসত গান-বাজনা, যাত্রা আসর। উৎসবের আনন্দে গা ভাসাতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসতেন। আর সকলের অংশগ্রহণে পুজোর চার দিন যেন হয়ে উঠত গোটা এলাকার মিলনমেলা। অতীতের সময় থেকেই বিনসিরার দুর্গাপুজোর আসল মাহাত্ম্য ছিল এটাই।
সম্প্রীতি স্লোগান আলাদা করে ছিল না, ছিল প্রতিদিনের জীবনযাপনের স্বাভাবিক অভ্যাস। সময়ের পরিবর্তনে উৎসবের সেই চেনা পরিবেশ হয়ত আজ অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। এলাকার বহু মুসলিম পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ায় আগের মতো দুই সম্প্রদায়ের মানুষের একসঙ্গে উৎসবে সামিল হওয়ার দৃশ্য আর সেভাবে চোখে পড়ে না। কিন্তু তার মাহাত্ম্য আজও ‘জীবন্ত’ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিতে।
পরিবারের সদস্য পীযূষ কান্তি লাহার কথায়, তাঁদের পারিবারিক দুর্গাপুজো বৈষ্ণব মতে অনুষ্ঠিত হয়। শাক্ত মতে পুজো হয় না, নেই বলির প্রথাও। অতীতের নিয়ম মেনে আজকের দিনেও নবমীর দিন অন্নভোগ নিবেদনের রীতি রয়েছে। দেবীর প্রতিমার রূপেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। প্রথম থেকে যে রূপে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে, আজও সেই রূপেই প্রতিমা তৈরি হয়।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলির বিনসিরা গ্রামে ৭৭ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো
সময় বদলেছে, চারপাশের সামাজিক পরিবেশ বদলেছে, কিন্তু পুজোর নিজস্ব রীতিনীতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখেছে লাহা পরিবার। প্রতিবছরক নিয়ম করে বিনসিরায় দুর্গাপুজো হয়ে চলেছে। কিন্তু উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই পুরনো সামাজিক ছবিটি যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। আর সেই শূন্যতার মধ্যেও সকলের কথায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে অতীতের সম্প্রীতির মূল্য।