ড° ফিরদৌস খান / মেওয়াট
ড° সিদ্দিক আহমদ মেও হচ্ছেন হরিয়ানার একজন সুপরিচিত সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তাঁকে একটি প্রতিষ্ঠান বললেও ভুল হবে না। কারণ তিনি তরুণ–তরুণীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও সাহস নিয়ে তিনি জীবনের অসাধারণ যাত্রা শুরু করেছিলেন।
১৯৬১ সালের ১০ এপ্রিল হরিয়ানার নুহ জেলার বানারসি নামে এক ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সিদ্দিক আহমদ মেও। তাঁর বাবা আব্দুল আজিজ ছিলেন শিক্ষিত কৃষক এবং মা সুভনী ছিলেন একজন গৃহিণী। তাঁর ব্যক্তিত্বের উপর বাবা–মায়ের গভীর প্রভাব ছিল। আজ তিনি যে অবস্থানে পৌঁছেছেন তার সমস্ত কৃতিত্ব তিনি তাঁদেরকেই দেন। তিনি প্রায়ই বলেন, “ঘরের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না, তাই আমার শৈশব অতিদারিদ্র্যের মধ্যেই কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু বাবার শিক্ষার প্রতি আকর্ষণই আমাকে আজ এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।”
ড° সিদ্দিক আহমদ মেও
শিক্ষায় সবসময় অসাধারণ দক্ষতা দেখানো সিদ্দিক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের বিদ্যালয়েই সম্পূর্ণ করেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেছিলেন। এরপর বাজিদপুর হাই স্কুল ও নুহর ঐতিহাসিক ইয়াসিন খান হাই স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যান। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি নুহর ইয়াসিন মেও ডিগ্রি কলেজ এবং পরে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হন, যেখানে ১৯৮২ সালে তিনি সিভিল ও রুরাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি কনিষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং চাকরির পাশাপাশি ২০১০ সালে বি–টেক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৯ সালে সহকারী উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি স্মরণ করে বলেন, “চাকরি আমার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু লেখা–লেখি ছিল আমার আবেগ।” ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যপুস্তক, বিশেষত ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর মেওয়াট ও মেও সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল, যেমন মেওদের দুর্বল বলা বা আওরঙ্গজেব জোরপূর্বক বদ্ধভাবে তাঁদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়েছিলেন এমন দাবি। তিনি ইতিমধ্যেই জানতেন যে খানওয়া যুদ্ধে হাসান খান মেওয়াটি বাবরের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।
ড° সিদ্দিক আহমদের লেখা বই
তিনি উপলব্ধি করেন যে, মেওয়াটের ইতিহাস বিশ্বের সামনে যুক্তিকভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৮–৮৯ সালের দিকে তিনি ইতিহাসের গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাস, রাজপুতানা ইতিহাস, জাট ইতিহাস এবং মেওয়াটের ইতিহাস নিয়ে বিশদ গবেষণা করেন। এই সময়ে তিনি শত শত গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
তিনি বলেন,“১৯৯১ সালে আমার প্রথম গবেষণাধর্মী লেখা ‘হরিয়ানা সংবাদ’, এ প্রকাশিত হয়। এরপর লেখালেখি অব্যাহত থাকে এবং ১৯৯৭ সালে আমার প্রথম বই ‘মেওয়াট: এক খোজ’ প্রকাশ পায়।”
এরপর ধারাবাহিকভাবে তাঁর আরও বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, মেওয়াতী সংস্কৃত, সংগ্রাম ১৮৫৭: মেওয়াতীয়োঁ কা য়োগদান, জারা ইয়াদ করিয়ে কুরবানি, অমর শহীদ রাজা হাসান খান মেওয়াতী, মেওয়াতী লোক সাহিত্য মেঁ দোহা পরম্পরা, গুল-এ-শহিদান, ভরামারু, ভারত–পাকিস্তান বিভাজন ও মেওয়াট, বিশ্ব সভ্যতা কো ইসলাম কি ডেন, পান্ডুন কা কড়াক সহ আরও অসংখ্য উল্লেখযোগ্য রচনা। কবিতার প্রতি ভালোবাসা থেকে তাঁর তিনটি কাব্যসংকলন প্রকাশিত হয়েছে, এবং দুটি প্রকাশের পথে। তাঁর প্রায় দুইশোরও বেশি কবিতা বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে।
ড° সিদ্দিক আহমদের লেখা বই
তাঁর বিস্তৃত সাহিত্যকর্ম শুধু মেওয়াটের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দলিল নয়, বরং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পরিচয়ের উৎস। সাহিত্যসাধনার জন্য তিনি চিরাগ–এ–মেওয়াট পুরস্কার, হরিয়ানা সাহিত্য একাডেমির প্রথম বই পুরস্কার, রাজস্থান সাহিত্য একাডেমির সরস্বতী সম্মান, মেওয়াট রত্ন সম্মান, গ্লোবাল প্রাইড অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য রাষ্ট্রীয় ও প্রাদেশিক সম্মান লাভ করেছেন। গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটিও তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।
ড° সিদ্দিক আহমদ মেও শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি একজন নিষ্ঠাবান সমাজসেবীও। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি মেওয়াটে সাক্ষরতা অভিযান শুরু করেন এবং মেও মুসলিম মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর প্রথম পথিকৃৎদের একজন ছিলেন। তিনি বাড়ি–বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন যে মেয়েদের শিক্ষা শুধু একটি অধিকার নয়, বরং সমাজ উন্নয়নের মূল স্তম্ভ। প্রথমদিকে প্রবল বাধা ও সন্দেহের মুখোমুখি হলেও তিনি হতাশ হননি। ধীরে ধীরে মানুষ তাঁর অভিযানে সাড়া দেয় এবং মেওয়াটে মেয়েদের শিক্ষা শুরু হয়।
ড° সিদ্দিক আহমদ মেও
১৯৯৬ সালে তিনি মেওয়াট এডুকেশনাল অ্যান্ড সোশ্যাল অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা মেওয়াটকে পৃথক জেলা ঘোষণার দাবিকে সংগঠিত রূপ দেয়। তাঁর অনমনীয় প্রচেষ্টা সফল হয় যখন ২০০৫ সালের এপ্রিলে মেওয়াটকে আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাঁর সংগ্রাম সেখানেই থেমে থাকেনি। যখন বলা হলো যে জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের নাম গুরগাঁও জেলার সঙ্গে যুক্ত, তাই সেটিকে মেওয়াট থেকে গুরগাঁওয়ে স্থানান্তর করা হবে, তখন তিনি এর জোরালো বিরোধিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি বাইত গ্রামে স্থাপন করাতে সক্ষম হন। তিনি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে ৪৩ দিনের আন্দোলনে বসে ছিলেন এবং অবশেষে শহীদ হাসান খান মেওয়াতী মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
তিনি বলেন, “২০১৭ সালে মেওয়াট খালের ঘোষণা করা হয় এবং ২০১২–১৩ সালে রেললাইনের অনুমোদন দেওয়া হয়। যদিও প্রকল্পগুলো এখনো শুরু হয়নি, এর জন্য আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।” তাঁর সংগঠন মেওয়াট বিকাশ সভা কৃষক আন্দোলন, CAA আন্দোলন এবং কসাইখানা ইস্যুসহ বহু আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০০১ সাল থেকে তিনি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আছেন।
সাহিত্য, সমাজসেবা, ক্রীড়া ও শিল্পের ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি একজন দক্ষ ক্রীড়া ও চিত্রশিল্পীও। জীবনের উদ্দেশ্য তিনি দুটো সুন্দর পঙ্ক্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন, “আমার জীবনের উদ্দেশ্য হলো, আমার দ্বারা যেন সবাই উপকৃত হয়; আমি পথের আলো হতে চাই, যাকে জ্বালিয়ে যেকোনো মানুষ নিজের জীবনপথ আলোকিত করতে পারে।”