বাংলা থেকে কমিক্সের ‘অস্কার’! বিশ্বজয়ী বঙ্গসন্তান চার্বাক দীপ্ত, কমিক্সের 'অস্কার' দৌড়ে বাঙালির 'লুবলুর পৃথিবী'
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
দেশে বসে কাজ করেও আন্তর্জাতিক কমিক্সের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন এক বাঙালী শিল্পী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তথা উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর ভূমিপুত্র চার্বাক দীপ্ত যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তা দেখে মুগ্ধ গোটা বিশ্বের শিল্পীমহল। কমিক্স দুনিয়ার ‘অস্কার’ বলে পরিচিত আইসনার অ্যাওয়ার্ডের (Will Eisner Comic Industry Awards) ডিজিটাল কমিক বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে তাঁর সৃষ্টি করা অনন্য গ্রাফিক নভেল ‘লুবলুর পৃথিবী’(The World of Lublu) । হার্ভে অ্যাওয়ার্ডের (Harvey Awards) ডিজিটাল বুক অফ দ্য ইয়ার ক্যাটেগরিতেও নাম উজ্জ্বল করেছেন বাঙালী শিল্পী চার্বাক। উভয় ক্ষেত্রেই ডিজিটাল কমিক ক্যাটেগরিতে জোড়া মনোনয়ন ছিনিয়ে নিয়েছে।
জানা গেছে, কোনো আন্তর্জাতিক বড় প্রকাশনার ব্যাকগ্রাউন্ড বা বিদেশি যোগাযোগের সাহায্য ছাড়া সম্পূর্ণ নিজের প্রতিভার জোরে কলকাতায় বসে দেশীয় প্রকাশনা সংস্থা 'বুক ফার্ম'-এর হাত ধরে এই সাফল্য পেয়েছেন। আর এতে করেই শিল্পী চার্বাক বুঝিয়ে দিলেন, শিল্পের সঠিক মর্যাদায় কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। প্রচ্ছদ শিল্পী ও গবেষক পিনাকী দে-র মতে, বিদেশি যোগাযোগ ছাড়া আঞ্চলিক ভাষায় কাজ করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছানোর এই নজির ভারতীয় কমিক্সের ভবিষ্যতের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।তিনি এক অর্থে সত্যিই পথপ্রদর্শক।
বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র চার্বাকের কাজে ভারতীয় বস্তুবাদী 'চার্বাক দর্শন'-এর স্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান বলে মনে করেন বহু গুণীজনেরা।তাঁর সৃষ্ট ‘লুবলুর পৃথিবী’ মূলত এক তরুণ ও তাঁর যুক্তিবাদী বন্ধু কিমের গল্প।'লুবলুর পৃথিবী'-তে তরুণ লুবলু ও তার যুক্তিবাদী বন্ধু কিমের এক পরাবাস্তব অভিযাত্রার মাধ্যমে বাস্তবতা, বোধ ও দর্শনের জটিল স্তর উন্মোচিত হয়েছে। জানা গেছে, লুবলু নামটা এসেছে রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’ ছবির বিখ্যাত রুশ শব্দ ‘ল্যুবল্যু’ (আমি ভালোবাসি) থেকে। ফরাসি কমিক্স স্টাইলের সাথে হার্জের ‘ক্লিয়ার লাইন’ ড্রয়িংয়ের মেলবন্ধনে এটি এক অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন এই বাঙালী শিল্পী। সাফল্যের সংবাদটা শোনার পর চার্বাক দীপ্ত-র অভিব্যক্তি ছিল, পাঠকের ভালো লাগবে কি না, তা না ভেবে নিজের ভাবনাটা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে এই স্বীকৃতি পাওয়া সত্যিই অভাবনীয়।
বিশ্বজয়ী বঙ্গসন্তান চার্বাক দীপ্ত
বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে দেখা যাবে, কমার্শিয়াল আর্টিস্টদের দুনিয়াটা খুব একটা মসৃণ নয়। তাঁদের লড়াইটা প্রতিদিনের। শুরুতে লুবলুর গল্প ইংরেজিতেই লিখেছিলেন। প্রকাশ করতে গিয়ে দেখলেন বড় বড় প্রকাশকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এরপরই চার্বাক বাংলায় বইটি প্রকাশের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বিপুল সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি বইটি 'নারায়ণ দেবনাথ পুরস্কার' জিতে নেয়। আর আজ আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য মিলতেই ইংরেজি সংস্করণ ছাপতে আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের মধ্যে যেন একপ্রকার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
শুধু লুবলু নয়, সুকুমার রায়ের ‘হ-য-ব-র-ল’-র গ্রাফিক রূপ, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কিংবা উইল আইসনারের ‘আ কন্ট্রাক্ট উইথ গড’-এর অসাধারণ বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে চার্বাক দীপ্ত ক্রমাগত নিজের কাজের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। ডিজিটাল ক্যানভাসকে হাতিয়ার করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলা কমিক্সের এই জয়যাত্রা বাঙালী শিল্পী তো বটেই ভারতীয় চিত্রশিল্পীদের জন্য এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন চার্বাক দীপ্ত । বিশ্ব কমিকসের দরবারে বাঙালি শিল্পীর এই বিজয় নিশান উড়ানো সত্যিই এক গর্বের মুহূর্ত ।