জন্মভূমি ইজরায়েল, ঠিকানা এখন মায়াপুর—সনাতন ধর্মের টানে জীবন বদলে ফেলা এক যুবকের বিস্ময়কর যাত্রা
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
জন্মভূমি ইজরায়েল। শৈশব, বেড়ে ওঠা, পারিবারিক পরিবেশ—সবকিছুই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সেই পরিচিত ভূখণ্ডকে ঘিরে। কিন্তু জীবনের এক সময় তিনি এমন এক পথের সন্ধান পান, যা তাঁকে নিজের দেশ, সংস্কৃতি, অভ্যাস এবং পরিচিত সামাজিক পরিসর ছেড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ভারতের মাটিতে এনে দাঁড় করায়। শুধু ভারতেই নয়, তিনি নিজের নতুন আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার মায়াপুরকে—যেখানে সনাতন ধর্ম, বৈদিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক সাধনাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
২০০৯ সালে পরিবারের সঙ্গে ভারতে আসার পর তাঁর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। বহু বিদেশির মতো পর্যটক হিসেবে নয়, বরং আত্মিক অনুসন্ধানের টানে তিনি ভারতীয় দর্শন ও সনাতন ধর্মকে গভীরভাবে জানতে চান। সেই অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে আসে মায়াপুরের গুরুকুল শিক্ষার পরিবেশে। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে বৈদিক মন্ত্র, যজ্ঞ, পূজাপদ্ধতি, শাস্ত্রচর্চা এবং সনাতনী জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করে ফেলেন তমাল। বছরের পর বছর অধ্যয়ন ও অনুশীলনের পর ২০২১ সালে গুরুকুল থেকে স্নাতক হয়ে তিনি যেন নিজের নতুন পরিচয়কে পূর্ণতা দেন।
আজ তাঁর জীবনযাত্রা দেখলে অনেকেই বিস্মিত হন। বিদেশি হয়েও তিনি একেবারে সনাতনী ব্রাহ্মণিক অনুশাসনের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। পরনে সাদা ধুতি, গলায় মালা, কাঁধে গেরুয়া বস্ত্র, মাথায় চুলহীন সরল উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে ফুটে ওঠে এক নিষ্ঠাবান আধ্যাত্মিক সাধকের প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিনের শুরু হয় সাত্ত্বিক খাদ্যাভ্যাস দিয়ে। খাদ্যতালিকায় থাকে ফল, শসা, টমেটো, টোফু, পনিরের মতো নিরামিষ উপাদান। তিনি নিজেকে শুধু নিরামিষাশী বলেই পরিচয় দেন না, বরং মনে করেন শরীর ও মনের শুদ্ধতার জন্য এই জীবনধারাই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, কঠোর নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সুগঠিত বডি বিল্ডার হিসেবে। সাধারণভাবে শরীরচর্চা ও বডি বিল্ডিংয়ের সঙ্গে আমিষ খাদ্যের সম্পর্কের যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, তাঁর জীবন সেই ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। আধ্যাত্মিকতা, শৃঙ্খলা, শরীরচর্চা এবং সনাতনী দর্শনের এক অনন্য সমন্বয় তাঁকে সমাজমাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
তমাল
বর্তমানে তিনি শুধু নিজের জীবনাচরণেই সীমাবদ্ধ নন। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তিনি সনাতন ধর্ম, বৈদিক সংস্কৃতি, যজ্ঞ, মন্ত্রজপ ও আধ্যাত্মিক জীবনদর্শন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তাঁর ভিডিও ও জীবনযাপন বহু মানুষকে বিস্মিত করছে, আবার অনেকের কাছে তা অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠছে। এক বিদেশি যুবকের এই রূপান্তর যেন দেখিয়ে দেয়, ধর্ম বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস কেবল জন্মসূত্রে নির্ধারিত নয়—তা হতে পারে ব্যক্তিগত উপলব্ধি, সাধনা এবং আত্মিক টানের ফল।
নিজের দেশ, নিজের জন্মপরিচয়, নিজের পুরনো সামাজিক বাস্তবতা ছেড়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতিকে জীবনের কেন্দ্র করে তোলা নিঃসন্দেহে সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু মায়াপুরের এই ইজরায়েলি যুবক প্রমাণ করেছেন, বিশ্বাসের শক্তি মানুষকে ভৌগোলিক সীমানার বহু ওপারে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর জীবন যেন এক জীবন্ত উদাহরণ—আধ্যাত্মিক টান যদি সত্যিই গভীর হয়, তবে জন্মভূমি বদলালেও মানুষ নিজের কাঙ্ক্ষিত আত্মিক ঠিকানা খুঁজে নিতে পারে।