বাংলাদেশ : বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল ও এক যুগের অবসান

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 3 Months ago
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (ফাইল চিত্র )
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (ফাইল চিত্র )

মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী, বিতর্কিত ও নির্ণায়ক ব্যক্তিত্বদের অন্যতম বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোরে, ৩০ ডিসেম্বর, রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। ভোর প্রায় ছয়টায়, ফজরের আজানের ঠিক পরেই, দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে ৭৯ বছর বয়সি এই নেত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতির এমন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল, যা কয়েক দশক ধরে দেশের ক্ষমতা, বিরোধী রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামতিন ক্ষেত্রকেই দিকনির্দেশনা দিয়েছে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি)-র চেয়ারপার্সন ও দুইবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ. জেড. এম. জাহিদ হুসেন। সে সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাবড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট ছেলের স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিনথি, ছোট ভাই শামীম এসকান্দার, বড় বোন সেলিনা ইসলামএছাড়াও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকেরা।


প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সংকটাপন্ন ছিল। ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। লিভারের সিরোসিস, কিডনি ক্ষতি, গুরুতর আর্থারাইটিস এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মতো প্রাণঘাতী রোগে ভুগে জীবনের শেষ মাসগুলোতে তিনি অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেন। মানবিক বিবেচনায় তাঁর চিকিৎসার জন্য ভারত আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আনুষ্ঠানিক জটিলতার কারণে সময়মতো উন্নত চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান, কিন্তু ততদিনে রোগ অনেকটাই আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।

১৫ আগস্ট ১৯৪৬ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তিনি ইস্কান্দার মজুমদার ও তাইবা মজুমদারের কন্যাতাঁর প্রাথমিক শিক্ষা দিনাজপুর গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে এবং উচ্চশিক্ষা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে সম্পন্ন হয়। ১৯৬০ সালে তাঁর বিয়ে হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খালেদা জিয়া প্রথম মহিলা হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেনএমন এক সময়ে, যখন দল ও দেশ উভয়ই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২ জানুয়ারি ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন, ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারপার্সন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। ১৯৮০এর দশকে তিনি তৎকালীন সামরিক শাসক এইচ. এম. এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সাত-দলীয় জোট গঠন করে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে স্বৈরশাসনের অবসান না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এই আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে তাঁকে সাতবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি করা হয়, আর এখান থেকেই ‘অটল নেত্রী’ হিসেবে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উত্তরাধিকার


২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হনতাঁর প্রথম মেয়াদে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং বৃত্তি কর্মসূচির মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেনসরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়যা তরুণদের জন্য স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ১১৬টি আসন নিয়ে তিনি সবচেয়ে বড় বিরোধী নেত্রী হন। ১৯৯৯ সালে চার-দলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দেয়। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তাঁর একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি কখনোই নিজের সংসদীয় আসন হারাননি।

বিতর্ক, দমন ও কারাবাস

২০০৬ সালে নির্ধারিত নির্বাচনের আগে তিনি পদত্যাগ করেন, কিন্তু সহিংসতা ও দাঙ্গার মধ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং দুর্নীতির নামে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়। ২০০৭ সালে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন; এটি শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর ঘটেদুই দশক ধরে ক্ষমতাবিরোধীদলের ভূমিকায় পালাবদল করা এই দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে একযোগে মামলা চলে। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন, কিন্তু ক্ষমতা যায় শেখ হাসিনার হাতে

২০১১ সালের পর একাধিক দুর্নীতির মামলায় তিনি জর্জরিত হন। ২০১৪ সালে বিএনপি সমর্থকেরা নির্বাচন বর্জন করেনঅভিযোগ ছিল নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী আসনগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০১৮ সালে অনাথালয় ট্রাস্ট-সংক্রান্ত কথিত অর্থ আত্মসাতের মামলায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যাকে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে। তিনি ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র বন্দি ছিলেন। এই সাজা তাঁকে জনপদের পদে অযোগ্য ঘোষণা করে, তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।


শেষ অধ্যায় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ২০২৪ সালে ব্যাপক জনআক্রোশের মুখে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়; অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তাঁর ব্যাংক হিসাবগুলো আনফ্রিজ করার নির্দেশ দেয়ততদিনে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান, কিন্তু ভাগ্য আর সময় দেয়নি

খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক গভীর আঘাত। তিনি ছিলেন এমন একমাত্র নেত্রী, যিনি তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে কখনো নির্বাচনী পরাজয়ের স্বাদ পাননি। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক, আর সমালোচকদের কাছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ক্ষমতায় থাকাকালীন যেমন, তেমনি কারাবন্দি অবস্থায়ও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও রূপ দিয়েছেন।


আজ ঢাকা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এক ‘অবিচল নেত্রী’ হিসেবেযিনি সংগ্রামকে উত্তরাধিকার বানিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো আপস করেননি।