শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
বীরভূমের সিউড়ির এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপক, এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি ধাপ জুড়ে রয়েছে নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। কাঁথাস্টিচ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া এবং হাজার হাজার মহিলাকে স্বনির্ভরতার পথ দেখানোর স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হলেন তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়।
সোমবার রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে পদ্মশ্রী সম্মান তুলে দেওয়া হয়। এই সম্মান পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত তৃপ্তি জানান, এটি তাঁর বহুদিনের স্বপ্নপূরণ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই স্বীকৃতির অপেক্ষায় ছিলেন। তবে এই সম্মান কেবল তাঁর একার নয়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁথাস্টিচ শিল্পেরও এক বড় স্বীকৃতি।
তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়
তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়ের শিল্পজীবনের শুরু শৈশবে। মা মায়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই তাঁর সূচ-সুতোর কাজের হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই কাপড়ের উপর নকশা আঁকা এবং রঙিন সুতোয় তাকে জীবন্ত করে তোলার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহই পরিণত হয় এক গভীর সাধনায়। ছোট ছোট নকশা থেকে শুরু করে শাড়ি, ওড়না এবং নানা ধরনের বস্ত্রের উপর কাঁথাস্টিচের সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে তিনি নিজস্ব শিল্পভাষা তৈরি করেন।
তবে তৃপ্তির কৃতিত্ব শুধু শিল্পচর্চায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই শিল্পকে কেন্দ্র করেই বহু মহিলার জীবনে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৯০ সালের পর থেকে তিনি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেন। বীরভূম জেলার গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মহিলাদের কাঁথাস্টিচের প্রশিক্ষণ দেন এবং তাঁদের হাতে তৈরি শিল্পসামগ্রী বাজারজাত করার ব্যবস্থাও করেন। ফলে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মহিলা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।
আজ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি মহিলাকে তিনি এই শিল্পে প্রশিক্ষিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে স্বনির্ভর এবং নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করছেন। বর্তমানে প্রায় ৪০০ মহিলা সরাসরি তাঁর সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছেন। বাকিরা নিজেদের মতো করে কাঁথাস্টিচের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একজন শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি সফল, তেমনি একজন সমাজগঠনের কারিগর হিসেবেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাঁর শিল্পকর্মের পরিচিতি শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত সরকারের উদ্যোগে তিনি বার্মিংহাম, লন্ডন এবং টোকিওতে ভারতীয় হস্তশিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিদেশের শিল্পপ্রেমীদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে তাঁর কাঁথাস্টিচের কাজ। বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পদ্মশ্রীর আগে তৃপ্তি মুখোপাধ্যায় একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার, বঙ্গশ্রী সম্মান এবং কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের সর্বোচ্চ হস্তশিল্প সম্মান ‘শিল্পগুরু’ পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। প্রতিটি সম্মানই তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও শিল্পসাধনার স্বীকৃতি বহন করে। তবে পদ্মশ্রী নিঃসন্দেহে তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
এই সম্মান পাওয়ার পরও তাঁর স্বপ্নের শেষ হয়নি। আগামী দিনে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলাদের মধ্যে কাঁথাস্টিচ শিল্পের প্রসার ঘটাতে চান তিনি। তাঁর মতে, বহু আদিবাসী মহিলার মধ্যে অসাধারণ সৃজনশীলতা রয়েছে, কিন্তু সুযোগের অভাবে তা বিকশিত হতে পারে না। ইতিমধ্যেই তিনি কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্থানীয় শিল্পরীতি ও কাঁথাস্টিচের সমন্বয়ে নতুন ধরনের শিল্পচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছেন।
তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়ের জীবনকাহিনি প্রমাণ করে, শিল্প শুধুমাত্র নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী মাধ্যম। সূচ-সুতোর নিপুণ বুননে তিনি যেমন কাপড়ে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পের সৌন্দর্য, তেমনই হাজার হাজার নারীর জীবনে এঁকেছেন আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা ও স্বনির্ভরতার নতুন ছবি। তাই পদ্মশ্রী সম্মান শুধু একজন শিল্পীর প্রাপ্তি নয়, এটি নারীশক্তি, লোকশিল্প এবং সমাজসেবার এক অনন্য প্রতিরূপ।