মানুষের জীবনে নীরব পরিবর্তনের কারিগর কেরলের IAS কর্মকর্তা ড. আদিলা আবদুল্লা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
মানুষের জীবনে নীরব পরিবর্তনের কারিগর কেরলের IAS কর্মকর্তা ড. আদিলা আবদুল্লা
মানুষের জীবনে নীরব পরিবর্তনের কারিগর কেরলের IAS কর্মকর্তা ড. আদিলা আবদুল্লা
 
শ্রীলতা এম 

প্রতিদিন বাসস্টপে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সময় অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, ভোরবেলায় কে রাস্তা পরিষ্কার করে গেল? অথবা শহরের প্রতিটি বাড়ি ও দোকান থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা তৈরি হয়, তা সত্ত্বেও শহর কীভাবে আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয় না? আবার কখনও উল্টোটাও মনে হয়। 
 
আসলে এসব কাজ পরিচালিত হয় এমন কিছু জনপরিষেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেগুলো অধিকাংশ সময়ই মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়। রাস্তা থেকে আবর্জনা সরিয়ে ফেলা হয়। সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা কেউ পায়, কেউ পায় না। ফাইল ও অনুমোদনের মাধ্যমে অফিসের কাজ চলে। কিন্তু এই প্রতিদিনের ফলাফলের পেছনে থাকেন এমন প্রশাসকরা, যারা একা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন; বরং অসংখ্য কর্মীকে নিয়ে গঠিত জটিল ও জীবন্ত ব্যবস্থার সমন্বয়কারী।
 
ড. আদিলা আবদুল্লা 
 
ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার (IAS) কেরল ক্যাডারের কর্মকর্তা ড. আদিলা আবদুল্লা এই ধরনের প্রশাসনিক পেশাজীবীদের অন্যতম। মালাবার অঞ্চলের প্রথমদিকের মুসলিম নারীদের মধ্যে একজন হিসেবে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করা আদিলা আজ কেরল সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগের বিশেষ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে নীতিনির্ধারণ সরাসরি মানুষের দুর্বলতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত।
 
সমাজকল্যাণ বিভাগ এমন মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করে, যারা প্রায়শই সমাজের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় এবং আরও অনেকে, যারা শুধু সহায়তার জন্য নয়, মর্যাদার জন্যও রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এই ক্ষেত্রে প্রশাসন কেবল নিয়মমাফিক ফাইল চালাচালির বিষয় নয়। বরং এটি নিশ্চিত করার বিষয় যে, সরকারি ব্যবস্থা বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছালে তা কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না।
 
একদিকে এই বিভাগগুলোকে বিপুল সংখ্যক মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের চাহিদার প্রতিও সাড়া দিতে হয়। এখানে আদিলা আবদুল্লার মতো একজন প্রশাসকের ভূমিকা হলো কর্মসূচি ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা। তাঁর দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে প্রকল্পগুলো সত্যিই নির্ধারিত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
 
বর্তমান দায়িত্বে আসার আগে ড. আদিলা কেরলের অন্যতম উচ্চাভিলাষী নগর প্রশাসন প্রকল্প কেরল সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (KSWMP)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা, বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং নিষ্পত্তি, সবকিছুকে একটি সুসংহত ব্যবস্থার আওতায় আনা।
 
ড. আদিলা আবদুল্লা
 
প্রকল্পটি রাজ্য, জেলা ও ব্লক স্তরে বিস্তৃত ৯৩টি নগর স্থানীয় সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তাও পেয়েছিল। এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে আদিলা আবদুল্লার দায়িত্ব ছিল পুরো ব্যবস্থার প্রতিটি কড়িকে সংযুক্ত রাখা।
 
সরকারি প্রকাশনা কেরালা কলিং-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি এই প্রকল্প ও তার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে লিখেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে প্রকল্পটি তাৎক্ষণিক সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দিয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি পুনরাবৃত্ত সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে, প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল এমন অবকাঠামো ও সক্ষমতা গড়ে তোলা যা কয়েক দশক ধরে কার্যকর থাকবে।
 
সামাজিক কল্যাণ ক্ষেত্রেও আদিলা আবদুল্লার কাজ, তাঁর আগের প্রকল্পের মতোই, নীতি ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি রাখে। এই প্রকল্পগুলোর সাফল্য একদিনে বোঝা যাবে না। এগুলো আগামী দশ বছরে একটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে।
 
 
তাই পর্দার আড়ালে কাজ করা প্রশাসকদের ভূমিকা নীরব হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজের জন্য খুব কমই জনসমক্ষে প্রশংসা বা স্বীকৃতি মেলে। কিন্তু মনে হয়, আদিলা আবদুল্লাকে শৈশব থেকেই এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
 
সম্প্রতি একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি স্মরণ করেছেন, কীভাবে তাঁর মা একসময় রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে থাকা গৃহহীন মানুষদের দেখে বলেছিলেন, যদি বড় হয়ে কখনও ক্ষমতা বা সামর্থ্য পাও, তবে যেন তাদের জন্য কিছু করো।
 
ড. আদিলা আবদুল্লা
 
আজ সমাজকল্যাণ বিভাগের বিশেষ সচিব হিসেবে আদিলা আবদুল্লা মনে করেন, তিনি হয়তো তাঁর মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে পারবেন, একটি ইচ্ছা, যা প্রত্যেক মায়েরই থাকা উচিত, যে কোনও শিশুর জন্য, তারা যেখানেই জন্মাক না কেন, কেউ যেন ঘর ছাড়া রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য না হয়।
 
তিনি জানান, শহুরে গৃহহীনদের জন্য যে প্রকল্প তিনি তৈরি করেছিলেন, তার অনুপ্রেরণা এসেছিল বহু বছর আগে মায়ের সেই কথাগুলো থেকেই। জীবনের প্রতিটি অনুপ্রেরণাকে তিনি আঁকড়ে ধরে রাখেন, আর সেগুলোই যেন তাঁকে একজন সৃজনশীল ও ইতিবাচক পরিবর্তনসাধক হিসেবে গড়ে তুলেছে। কিছুদিন আগে নগর উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি লিখেছিলেন, তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেন তাঁর বাবা, যাকে তিনি ‘ওশো আবদুল্লা’ বলে ডাকেন।
 
ফেসবুকে তাঁর একটি পোস্ট প্রায় স্মৃতিকথার রূপ নিয়েছিল, যেখানে তিনি লিখেছিলেন কীভাবে তাঁর বাবা আজও তাঁর কাজ ও চিন্তাকে প্রভাবিত করেন। তিনি লিখেছিলেন, “জীবনে আমি আমার বাবাকে মাত্র একবার নামাজ পড়তে দেখেছি, ঈদের নামাজে। কিন্তু তিনি সবসময় অন্যদের মসজিদে যেতে উৎসাহিত করতেন। কখনও কাউকে বিদ্রূপ করতে বা কারও সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে তাঁকে শুনিনি।”
 
তিনি আরও লেখেন, তাঁর মা নিয়মিত দিনে পাঁচবার নামাজ আদায় করতেন, কিন্তু তাঁর বাবা কখনও তাতে আপত্তি করেননি। বরং তাঁদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুন্দর।
 
মালাবারের গল্পকার রাসকিন বন্ড-এর কোনও উপন্যাসের অধ্যায়ের মতোই তিনি লিখেছেন, “মাহে থেকে ফেরার সময় বাবা পাতা মোড়ানো ভাজা ট্যাপিওকা নিয়ে আসতেন, সঙ্গে থাকত নানা গল্প। আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা করতাম, কারণ তখনই গল্পের ধারা শুরু হতো। সেই রাতগুলোতেই গল্প করতে করতে ঘুম নেমে আসত।
 

আমি আর বাবা পাশাপাশি বসে থাকতাম, যতক্ষণ না তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। সেই সময়েই আমি পড়েছি Citadel, হারমান হেসে-র Siddhartha, এম. টি. বাসুদেবন নাইয়ার-এর গল্প, পুনাথিল কুঞ্জাবদুল্লা এবং খুশবন্ত সিং-এর লেখা। গল্প শুনতে শুনতে, খেতে খেতে আর পড়তে পড়তেই রাত কেটে যেত। আমার সামনে এক বিশাল পৃথিবী খুলে গিয়েছিল।”
 
তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি দেখলে বোঝা যায়, এই গল্পগুলো তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, ছোটবেলায় দু’জন মানুষ তাঁকে বলেছিলেন যে বড় হয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করবেন। একজন ছিলেন তাঁর বাবা, যাকে তিনি ‘কুঞ্জাপ্পা’ বলে ডাকতেন, আর অন্যজন ছিলেন তাঁর প্রতিবেশী ‘পাপ্পেট্টান’।
 
জ্যোতিষশাস্ত্র অধ্যয়ন করা পাপ্পেট্টান বহু বছর মাদ্রাজে বাস করেছিলেন। গুগল বা ইন্টারনেটবিহীন সেই সময়ে, তাঁর বাবা ও পাপ্পেট্টানের সঙ্গে কথোপকথনই ছিল বাইরের পৃথিবীকে জানার জানালা।
 
তিনি লিখেছেন, “তাঁদের মাধ্যমে আমি এমন সব দেশ, মানুষ ও গল্প দেখেছি, যেগুলোর সঙ্গে আমার বাস্তবে কখনও পরিচয় হয়নি। সেখান থেকেই আমি ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হয়েছি, যা আজ আমি। সিভিল সার্ভিসে যোগদানের বহু আগেই সেই জগতগুলো আমার চিন্তাভাবনাকে গড়ে তুলেছিল। আমি আজও সেই মূল্যবোধগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করি। এগুলো আমাকে সাহস দেয়, আর আমি বিশ্বাস করি, যে কোনও মেয়েকেও সাহস জোগাতে পারে।”
 
তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া কিছু জীবনদর্শনের কথাও ভাগ করে নিয়েছেন, যেগুলোকে তিনি ‘মুক্তো’ বা অমূল্য শিক্ষা বলে মনে করেন। এর মধ্যে প্রথমটি হলো আশা। তাঁর বাবা বলতেন, পৃথিবীতে যদি একজন মানুষও বেঁচে থাকে, তবুও আশা বেঁচে থাকে। আরও একটি শিক্ষা ছিল, কেউই অপরিহার্য নয়; আমরা থাকি বা না থাকি, জীবন চলতে থাকে।
 
তিনি শিখেছেন, ব্যর্থতা বলে কিছু নেই, যদি না আমরা তাকে চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মেনে নিই। শেখার প্রক্রিয়া কখনও থামানো উচিত নয় এবং যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন ভালো কাজ করে যাওয়া উচিত। এই উপদেশগুলো, যেগুলোকে তিনি স্নেহভরে ‘মুক্তো’ বলে উল্লেখ করেন, তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের। আর প্রতিদিন অসংখ্য অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে স্পর্শ করা যে দায়িত্ব তিনি পালন করছেন, সেখানে এই জীবনদর্শনের মুক্তোগুলো নিঃসন্দেহে তাঁকে আরও শক্তি ও প্রেরণা জোগাচ্ছে।