শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
রাজনীতির মঞ্চে অনেকেই আসেন, অনেকেই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছান। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁদের পরিচয় পদ বা ক্ষমতার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। হুগলির বলাগড়ের মেয়ে সুমনা সরকার তেমনই এক নাম, যার রাজনৈতিক সাফল্যের ভিত গড়ে উঠেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অগণিত বাস্তব ঘটনার উপর।
২০২০ সালের শেষ দিকের একটি ঘটনা আজও অনেকের মনে জ্বলজ্বল করে। এক অসহায় মানুষ জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য স্বাস্থ্যসাথী কার্ড করাতে হুগলি জেলা শাসকের দপ্তরে গিয়েছিলেন। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন টেবিলে ঘুরেও তিনি কোনও সমাধান পাননি। হতাশ, ক্ষুব্ধ ও অসহায় অবস্থায় তিনি ফোন করেন পরিচিত এক সমাজকর্মীকে। বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ করেও যখন কোনও পথ খোলা যাচ্ছিল না, তখন শেষ ভরসা হিসেবে ফোন করা হয় সুমনা সরকারকে।
সুমনা সরকার শুধু বিষয়টি শোনেননি, নিজে উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। তারপর বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিট নাগাদ সেই অসহায় মানুষটির ফোন আসে, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হয়ে গেছে, অস্ত্রোপচার করানো সম্ভব হবে। একজন মানুষের জীবনের কঠিন মুহূর্তে এই সাহায্য ছিল আশার আলো। এমন ঘটনা শুধু একটি নয়, অসংখ্য মানুষের জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার নাম।
সুমনা সরকারের জীবনযাত্রাও কম সংগ্রামের নয়। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও তিনি নিজের পরিচয় গড়েছেন নিজের কর্মে। প্রাক্তন কংগ্রেস বিধায়ক বীরেন সরকারের কন্যা হিসেবে রাজনীতির পরিবেশে বড় হয়েছেন। ছাত্রজীবন থেকেই মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, সমাজের সমস্যাগুলি কাছ থেকে দেখেছেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ সময় জেলা পরিষদে কাজ করেছেন, গ্রামবাংলার মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজনকে নিজের অভিজ্ঞতার অংশ করে তুলেছেন।
ক্ষমতা তাঁর কাছে কখনও লক্ষ্য ছিল না, বরং মানুষের জন্য কাজ করার একটি মাধ্যম ছিল। তাই রাজনৈতিক পথচলায় নানা উত্থান-পতন, মতাদর্শগত পরিবর্তন এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি মানুষের সংযোগ হারাননি। মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়েই তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও আস্থার স্বীকৃতি পান। সেই আস্থার মূল্য দিয়েই আজ তিনি রাজ্যের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর পরিচয় বদলায়নি। তিনি এখনও সেই মানুষ, যিনি অসহায়ের ফোন ধরেন, সমস্যার কথা শোনেন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন।
সাধারণ মানুষের ঘর থেকে উঠে এসে জনসেবা করতে করতে রাজ্যের মন্ত্রিত্বের দায়িত্বে পৌঁছানো কোনও সহজ যাত্রা নয়। এটি এক দীর্ঘ অধ্যবসায়, নিষ্ঠা এবং মানুষের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফল। সুমনা সরকারের গল্প তাই কেবল একজন রাজনীতিকের সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি মানবিকতা, পরিশ্রম এবং মানুষের আশীর্বাদে গড়ে ওঠা এক অনন্য যাত্রার গল্প।
আজও বলাগড়ের বহু মানুষের কাছে তিনি শুধুই একজন মন্ত্রী নন, তিনি এমন এক নির্ভরতার নাম, যিনি প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান। আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর প্রকৃত সাফল্য, ক্ষমতার উচ্চতায় নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার সাফল্য।