ধর্ম নয়, স্বপ্নই হয়ে উঠল বন্ধন: স্বামীর সমর্থনে মাতৃত্ব আর NEET প্রস্তুতির পথে ২০ বছরের সানিয়া

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
ধর্ম নয়, স্বপ্নই হয়ে উঠল বন্ধন: স্বামীর সমর্থনে মাতৃত্ব আর NEET প্রস্তুতির পথে ২০ বছরের সানিয়া
ধর্ম নয়, স্বপ্নই হয়ে উঠল বন্ধন: স্বামীর সমর্থনে মাতৃত্ব আর NEET প্রস্তুতির পথে ২০ বছরের সানিয়া
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস বাংলা

ইনস্টাগ্রামে তাঁর পরিচয় ‘@dr_neetmom’। প্রোফাইলের বায়োতে মাত্র তিনটি শব্দ, “Studying between baby naps”। কথাগুলো পড়লে অনেকের কাছে হয়তো মিষ্টি বা আবেগঘন মনে হতে পারে, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তরুণীর নিরন্তর সংগ্রাম। পাঁচ মাসের কন্যাসন্তান এলিজাকে কোলে নিয়ে ভারতের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা NEET-এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ২০ বছরের সানিয়া। মা হিসেবে দায়িত্ব পালন, সংসার সামলানো এবং চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের জন্য পড়াশোনা, সবকিছুই একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি।
 
দিল্লির বাসিন্দা সানিয়ার জীবনের গল্প সাধারণ নয়। মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা সানিয়ার ওপর দশম শ্রেণি পাস করার পর থেকেই বিয়ের চাপ বাড়তে থাকে। তাঁর দাবি, পরিবার যথেষ্ট রক্ষণশীল হওয়ায় উচ্চশিক্ষা বা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের প্রতি সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম ছিল। সেই পরিস্থিতিতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যদি বিয়ে করতেই হয়, তবে নিজের পছন্দের মানুষকেই বিয়ে করবেন। সেই মানুষ ছিলেন বিশাল। পরিবারের আপত্তি এতটাই তীব্র ছিল যে একসময় বিষয়টি পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নানা বাধা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিয়ে হয়।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by saniya (@dr_neetmom)

 
মজার বিষয় হল, সানিয়ার কাছে বিয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কের সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল নিজের শিক্ষাজীবনকে বাঁচিয়ে রাখারও একটি উপায়। বিয়ের সময় তাঁর স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু নতুন সংসারে এসে তিনি পড়াশোনা আবার শুরু করেন এবং দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হন। এরপর জীবনে আসে আরেকটি বড় পরিবর্তন, মাতৃত্ব। কন্যাসন্তান এলিজার জন্মের পর অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন তাঁর শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।
 
শিশুর জন্মের মাত্র দেড় মাস পর থেকেই সানিয়া ফের NEET-এর প্রস্তুতিতে মন দেন। তাঁর দিন শুরু হয় সন্তানের চাহিদা মেটানো দিয়ে, আর পড়াশোনার সময় আসে যখন এলিজা ঘুমিয়ে পড়ে অথবা গভীর রাতে বাড়ির অন্য সবাই বিশ্রামে যায়।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by saniya (@dr_neetmom)

 
সানিয়ার কথায়, বাস্তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। অনেক সময় ঘরের কাজ, সন্তানের যত্ন এবং পড়াশোনার চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তবুও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তাঁকে থামতে দেয় না। বর্তমানে তিনি অনলাইন কোচিং এবং স্ব-অধ্যয়নের মাধ্যমে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি নিজের প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প সামাজিক মাধ্যমেও তুলে ধরেন, যা তাঁকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হতে সাহায্য করে।
 
এই লড়াইয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি স্বামী বিশাল। পেশায় একজন গিগ কর্মী হলেও স্ত্রীর স্বপ্নপূরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সানিয়া জানান, সংসারের দায়িত্ব শুধু তাঁর একার নয়, এই বিশ্বাস থেকেই বিশাল ঘরের কাজ এবং মেয়ের দেখাশোনায় সমানভাবে সাহায্য করেন। যখনই তিনি হতাশ হয়ে পড়েন, বিশাল তাঁকে উৎসাহ দেন এবং পরিশ্রম চালিয়ে যেতে বলেন। তাঁর মতে, স্বামীর এই সমর্থন না থাকলে এতদূর এগিয়ে আসা সম্ভব হতো না।
 
তবে পথ চলার সময় হতাশার মুহূর্তও এসেছে। দেশজুড়ে আলোচিত NEET প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের খবর শুনে সানিয়া গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এত পরিশ্রমের হয়তো কোনও মূল্যই থাকবে না। কিন্তু সেই সময়ও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিষাল, যিনি তাঁকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিলেন।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by saniya (@dr_neetmom)

 
বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম থেকে বাস্তব জীবন, সব জায়গাতেই নানা কটাক্ষ ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। কেউ বলেন, বিয়ে এবং সন্তানের পর আর নতুন করে কিছু করার নেই। কেউ আবার তাঁর প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিতেই চান না। কিন্তু সানিয়া মনে করেন, সমাজের এই ধারণাগুলোকেই বদলানো দরকার। তাঁর বিশ্বাস, কোনও মেয়ের স্বপ্ন শুধুমাত্র বিয়ে বা মাতৃত্বের কারণে শেষ হয়ে যেতে পারে না। আজ তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সেই সব নারী ও মায়েদের জন্যও এগিয়ে চলেছেন, যারা কোনও না কোনও কারণে নিজেদের স্বপ্নকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
 
শিশুর ঘুমের ফাঁকে বই খুলে বসা এই তরুণী জানেন, পথ এখনও অনেক বাকি। তবু তাঁর চোখে একটাই লক্ষ্য, একদিন চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রন পরে প্রমাণ করা, স্বপ্নের সামনে কোনও সামাজিক বাঁধাই শেষ কথা নয়।