শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কলকাতার ব্যস্ত রাজপথে হঠাৎ যদি এক হিজাব পরিহিতা তরুণী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাইক চালিয়ে চলে যান, তাহলে এখন আর তা দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শহরের মানুষ এখন তাকে ‘হিজাবি বাইকার’ হিসেবেই চেনে। তার নাম আলিমা রহমান—এক সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে, যার অদম্য জেদ, অধ্যবসায় এবং পরিবারের সমর্থন তাকে আজ এই পরিচিতি এনে দিয়েছে।
বাইকের প্রতি আলিমার আকর্ষণের শুরু হয়েছিল ছোটবেলাতেই। পরিবারের এক আত্মীয়—কাকাকে বাইক চালাতে দেখেই তার মনে বাইকের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হয়। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ ছিল না। একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে মেয়ের বাইক চালানো নিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের তীব্র আপত্তি ছিল। “পর্দা প্রথা মেনে চলা বাড়ির মেয়ে রাস্তায় বাইক চালাবে”—এই ধারণাটি মেনে নেওয়া অনেকের পক্ষেই কঠিন ছিল।
কিন্তু আলিমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার বাবা আজিজুর রহমান। মেয়ের স্বপ্নকে দমিয়ে না রেখে বরং তিনিই প্রশিক্ষক হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন। মাত্র ১০–১১ বছর বয়স থেকেই বাবার হাত ধরে আলিমার বাইক চালানোর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। হাতে গিয়ার ধরে, মাঠে-ঘাটে অনুশীলন করতে করতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।
আলিমা রহমান
তবে সমাজের কটূদৃষ্টি থেকে তিনি রেহাই পাননি। পাড়ার ছেলেদের কটুক্তি, ব্যঙ্গ, কখনও আবার ইচ্ছাকৃতভাবে উত্যক্ত করা—এই সব কিছুরই মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। রাস্তায় বেরোলেই নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হতো। কিন্তু আলিমা দমে যাননি। নীরবে এবং সংযতভাবে তিনি নিজের লক্ষ্যপানে এগিয়ে গিয়েছেন। তার একটাই উদ্দেশ্য ছিল—বাইক চালানো শেখা এবং প্রমাণ করা যে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
আজ কুড়ির কোঠা পেরোনো আলিমা কলকাতা শহরের এক পরিচিত মুখ। হিজাব পরে নিয়মিত বাইক চালানোর জন্যই তার এই বিশেষ পরিচিতি। তিনি কখনও নিজের ধর্ম বা সংস্কৃতি থেকে সরে যাননি। বাইরে বেরোলেই তিনি হিজাব পরেন, অথচ সেই হিজাবের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক দৃঢ়চেতা বাইকারের আত্মবিশ্বাস। রাস্তায় বেরোলেই তার দৃষ্টি থাকে কেবল গন্তব্যের দিকে, কোনো কিছুতেই তার মনোযোগ বিচ্যুত হয় না।
আলিমার বাবা আজিজুর রহমান জানান, “মেয়ে বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা হয়। ঘুম আসে না, বারবার বাইরে পায়চারি করি। কিন্তু আমি কখনও তার স্বাধীনতায় বাধা দিতে চাইনি। মেয়ে বলে তাকে বেঁধে রাখা উচিত নয়।” তিনি বিশ্বাস করেন, ভরসা ও সাহস দিলে মেয়েরাও নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে পারে।
অন্যদিকে, আলিমাও বারবার তার বাবা-মায়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, বাবা-মায়ের বিরোধিতা করে জীবনে এগোনো যায় না। তিনি বলেন, “তাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে, রাজি করিয়ে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। উন্নতির জন্য বাবা-মায়ের আশীর্বাদ অত্যন্ত জরুরি।”
আলিমা রহমান
বাইক চালানো নিয়ে আলিমার বার্তা স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, আজকাল অনেক মেয়েই বাইরে বেরোচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং ওভারটেকিং এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। শুধু মেয়েরাই নয়, ছেলে-মেয়ে সকলেরই ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা উচিত বলে আলিমা বিশ্বাস করেন।
বহু বছর ধরে বাইক চালানোর পরও আজ পর্যন্ত তিনি কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হননি। তার দাবি, সতর্কতা অবলম্বন করলে এবং নিয়ম মেনে চললে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এই বার্তাই তিনি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান—রাস্তায় বাইক নিয়ে বেরোলে শুধু নিজের নয়, অন্যের নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখতে হবে।
‘হিজাবি বাইকার’ আলিমা রহমান আজ শুধু একজন বাইকচালক নন, তিনি সমাজের জন্য এক বার্তাবাহক। তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং স্বপ্ন—এই তিনটিকেই একসঙ্গে নিয়ে জীবন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।