গুয়াহাটি ঃ
টানা দ্বিতীয়বারের জন্য অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। মঙ্গলবার গুয়াহাটির খানাপাড়ায় আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য।এই শপথ গ্রহণ সহ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নরেন্দ্র মোদী, মুখ্যমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন-সহ বিজেপি ও এনডিএ জোটের একাধিক শীর্ষ নেতা।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিসভার পাঁচজন সদস্যও এদিন শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামেশ্বর তেলি, অসম গণ পরিষদের সভাপতি অতুল বরা, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি লিবারেলের নেতা চরণ বড়ো এবং বিজেপির বর্ষীয়ান নেত্রী অজন্তা নেওগ।
অনুষ্ঠানে এনডিএ শাসিত ২২টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপির জাতীয় নেতৃত্ব, শিল্পপতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও অসমের বৈষ্ণব মঠের ১৫ জন সত্রাধিকারের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
ঐতিহ্যবাহী অসমিয়া পোশাকে মঞ্চে আসেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। শপথ গ্রহণের সময় উপস্থিত বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে গোটা অনুষ্ঠানস্থল।হিমন্ত বিশ্ব শর্মা টানা দ্বিতীয়বারের মতো অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া শুধু নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তিরও প্রতিফলন।
উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে পরিচিত হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিরোধীদের সমালোচনা এবং তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগের মাঝেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি অসমে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে শাসক জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষে নিয়ে গেছে।
৫৭ বছর বয়সী এই নেতা জানিয়েছেন, রাজ্যের উন্নয়নের যাত্রা তিনি আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। তাঁর ভাষায়, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদ ছিল “শুধু ট্রেলার, আসল সিনেমা দেখা যাবে দ্বিতীয় মেয়াদে।”
প্রথম মেয়াদে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, জনকল্যাণ প্রকল্প এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমির অধিকার রক্ষার পদক্ষেপের পাশাপাশি তাঁর সরকার কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তও নিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য ও কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিতর্কের জন্ম দেয়।
অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান, বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযান, বহুবিবাহ রোধে পদক্ষেপ, গবাদি পশু সুরক্ষা আইন কার্যকর করা এবং সরকারি মাদ্রাসা বন্ধের মতো সিদ্ধান্তের জন্য বিরোধীরা তাঁকে সামাজিক বিভাজন বাড়ানোর অভিযোগ তোলে।
বিতর্কের মাঝেও হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। পবন খেরা তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে অভিযোগ তোলার পর তা বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয় এবং বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যায়েও পৌঁছায়।
বিরোধী দল, বিশেষ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, তাঁর শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং তাঁর স্ত্রীর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অসম বিধানসভার ১২৬টি আসনের মধ্যে ৮২টি আসন জিতে বিজেপির বড় জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ তাঁর কিছু বক্তব্যকে বিভাজনমূলক এবং সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির জন্য অনুপযুক্ত বলেও সমালোচনা করেছেন।
১৯৯৬ সালে প্রথম নির্বাচনে পরাজিত হলেও, ২০০১ সাল থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে জালুকবাড়ি কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। হিতেশ্বর শইকিয়া এবং তরুণ গগৈর রাজনৈতিক পরামর্শে তিনি কংগ্রেসে উঠে আসেন। তবে মতপার্থক্যের কারণে ২০১৫ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।
এরপর তিনি উত্তর-পূর্বে বিজেপির বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখেন এবং উত্তর-পূর্ব গণতান্ত্রিকটের আহ্বায়ক হিসেবে আটটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যকে এনডিএ-র আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যোরহাটে জন্ম নেওয়া হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিশিষ্ট অসমীয়া কবি ও সাহিত্যিক কৈলাশ নাথ শর্মা এবং সাহিত্যকর্মী মৃণালিনী দেবীর সন্তান। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি নিয়ে পাঁচ বছর গৌহাটি হাইকোর্ট-এ আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর ২০০১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।