তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের আগুন! ‘অপারেশন যুবরাজ’-এর জেরে অস্তিত্বের লড়াইয়ে মমতা শিবির
দেবকিশোর চক্রবর্তী
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে ‘অপারেশন যুবরাজ’। মাত্র দশ দিনের এক গোপন রাজনৈতিক অভিযানের জেরে কার্যত আড়াআড়ি বিভাজনের মুখে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই বহুচর্চিত অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য নির্বাচিত দুই বিধায়ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। দু’জনেই এবার প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় নবীন হলেও তাঁদের নেতৃত্বেই দলের একাংশের বিধায়কদের মধ্যে সংগঠিত হয়েছে এক শক্তিশালী অসন্তোষের মঞ্চ। সূত্রের দাবি, ‘ওসিপি’ নামে সাংকেতিক পরিচয় ব্যবহার করে গত দশ দিন ধরে একাধিক বিধায়কের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেই যোগাযোগের মূল বিষয় ছিল দলের বর্তমান নেতৃত্ব, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ।
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করেই দলের ভিতরে যে একটি বিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, সেই ইঙ্গিত গত কয়েক মাস ধরেই মিলছিল। কিন্তু সেই ক্ষোভ যে এত দ্রুত সাংগঠনিক রূপ নেবে, তা হয়তো অনেকেই কল্পনা করেননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ শুধু ব্যক্তিগত মতভেদের প্রশ্ন নয়; বরং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রকে ঘিরে বৃহত্তর লড়াই।
ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ককে কেন্দ্র করে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দু’দফায় বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে প্রবীণ নেতা ও দশ বারের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু অধ্যক্ষ সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে আরও উসকে দেয় এবং বিদ্রোহী শিবিরের কাছে বড় রাজনৈতিক সুযোগ এনে দেয়।
এরই মধ্যে দিল্লির বঙ্গভবনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠক নতুন করে জল্পনার আগুনে ঘি ঢালে। সেই সাক্ষাতের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয় যে ঋতব্রত হয়তো দলত্যাগ করতে চলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দল ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে দলের ভেতরেই শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নেওয়া হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এ কি শুধুই দুই নবীন বিধায়কের উদ্যোগ, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক কৌশল?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এত বড় সাংগঠনিক তৎপরতা এবং এত সংখ্যক বিধায়কের সমর্থন একা দু’জন বিধায়কের পক্ষে সংগঠিত করা সহজ নয়। ফলে পর্দার আড়ালে আরও প্রভাবশালী কোনও নেতা বা গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই কারণেই ‘অপারেশন যুবরাজ’ এখন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই দ্রুত সক্রিয় হয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সূত্রের খবর, তিনি ইতিমধ্যেই দলের বিভিন্ন কমিটি ভেঙে দিয়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি জেলা ও রাজ্য স্তরের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিদ্রোহী শিবিরকে মোকাবিলা করতে এবং দলের ভিতরে নতুন ঐক্য গড়ে তুলতে কড়া সাংগঠনিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে ‘একের বিরুদ্ধে এক’ রাজনৈতিক কৌশলকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সফরের মাধ্যমে তিনি শুধু দলের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলাই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিতে চাইছেন।
তবে সব প্রশ্নের কেন্দ্রে এখন একটাই বিষয়, তৃণমূল কংগ্রেস কি এই সংকট কাটিয়ে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে, নাকি ‘অপারেশন যুবরাজ’ রাজ্যের শাসকদলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অন্তর্ঘাতের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হবে? আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই সেই উত্তর দেবে।