৭৫-এ থামল নানার পাটেকরের পথচলা, হৃদ্‌রোগে প্রয়াত বলিউডের দাপুটে অভিনেতা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
৭৫-এ থামল নানার পাটেকরের পথচলা, হৃদ্‌রোগে প্রয়াত বলিউডের দাপুটে অভিনেতা
৭৫-এ থামল নানার পাটেকরের পথচলা, হৃদ্‌রোগে প্রয়াত বলিউডের দাপুটে অভিনেতা
 
নয়া দিল্লি

ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা নানার পাটেকর আর নেই। ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে গোয়ায় নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন প্রবীণ এই অভিনেতা। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে লাগাতার CPR দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. শেখর সালকার জানিয়েছেন, ঘটনায় মেডিকো-লিগ্যাল কেস (MLC) নথিভুক্ত হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত করা হবে।

নানা পাটেকরের প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি, দুই চলচ্চিত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী ও শক্তিশালী পর্দা উপস্থিতির ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি।
 
‘গমন’ থেকে ‘পরিন্দা’, দীর্ঘ অভিনয়জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়
 
মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জাঞ্জিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নানার। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। এরপর একের পর এক হিন্দি ও মারাঠি ছবিতে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি।
 
১৯৮৮ সালে অস্কার মনোনীত ছবি ‘সালাম বম্বে’-তে অভিনয়ের পর তাঁর কেরিয়ার আরও গতি পায়। ১৯৮৯ সালের অপরাধমূলক ছবি ‘পরিন্দা’-য় অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতা এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান পান। ‘ক্রান্তিবীর’, ‘প্রহার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’, ‘ওয়েলকাম’-সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
 
তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং দুটি মহারাষ্ট্র স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। মারাঠি চলচ্চিত্রেও অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড মারাঠি। ২০১৩ সালে ভারতীয় সিনেমা ও শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
 
জীবনের শেষ পর্বেও অভিনয় থেকে সরে যাননি নানা। ‘হাউসফুল ৫’-এ অক্ষয় কুমার, অভিষেক বচ্চন ও রীতেশ দেশমুখের সঙ্গে অভিনয় করেন। বিশাল ভরদ্বাজের ‘ও’ রোমিও’-তে শাহিদ কাপুর ও তৃপ্তি ডিমরির সঙ্গে দেখা যায় তাঁকে। ‘সুবেদার’-এও ছিল তাঁর বিশেষ উপস্থিতি।
 
অভিনেতার পাশাপাশি ছিলেন টেরিটোরিয়াল আর্মির ক্যাপ্টেন
 
নানা পাটেকরের জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে। ১৯৮৮ সালে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির প্রস্তুতির সময় প্রায় তিন বছর সামরিক প্রশিক্ষণও নেন তিনি। ছবিটি পরবর্তীতে তাঁর পরিচালনায় প্রথম ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই সময়ের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভি কে সিংও ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।
 
তারকা হয়েও জীবন ছিল মাটির কাছাকাছি
 
পর্দার বাইরে নানা পাটেকরের জীবনযাপনও ছিল বেশ সাদামাটা। রান্না করতে ভালোবাসতেন তিনি। নিজের হাতে রান্না করে বন্ধুদের খাওয়াতেও পছন্দ করতেন।
 
ছেলে মালহার পাটেকরও অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নিজের তারকা-পরিচিতি ব্যবহার করে ছেলের কেরিয়ার তৈরি করতে কখনও সাহায্য করেননি নানা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সাফল্য অর্জন করতে হলে নিজের পরিশ্রমেই জায়গা তৈরি করতে হয়। তাই মালহারকেও নিজের যোগ্যতায় পরিচিতি তৈরি করার সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি।
 
কৃষক থেকে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো মানুষ
 
সিনেমার আলো থেকে দূরে নানা পাটেকরের আর একটি পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। জানা যায়, তিনি গম, ধান-সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। সেই ফসল বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একটি অংশ অসহায় কৃষকদের সাহায্যে ব্যবহার করতেন।
 
কৃষক আত্মহত্যার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশেও দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কৃষকদের বিধবাদের সেলাই মেশিন দিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। লাতুরে প্রায় ৬২টি পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানা যায়।
 
তাই নানার পাটেকরের পরিচয় শুধু ‘অভিনেতা’ শব্দে সীমাবদ্ধ ছিল না। শক্তিশালী অভিনয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের হাতে রান্না করা, কৃষিকাজ করা কিংবা ছেলেকে নিজের পরিচয়ে নয়, নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা, সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল পর্দার বাইরেও এক অন্যরকম গল্প।
 
ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অভিনয়ের ছাপ যেমন দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনই তাঁর ব্যক্তিত্বের নানা দিকও তাঁকে অন্য অনেক তারকার থেকে আলাদা করে রাখবে।