মায়ের গয়না বিক্রি করে সাকিবের ক্রিকেট খেলা, সেই সাকিব আইপিএলে ৪ উইকেট নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনায়
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী:
আইপিএলের মঞ্চে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন নায়ক। এমনই এক নায়কের জন্ম হলো গত সোমবার সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে। সেদিন এক রূপকথার জন্ম দিলেন বিহারের তরুণ পেসার সাকিব হুসেন। একেবারে যা তা দল নয়। এবারের আইপিএলে অপরাজিত রাজস্থান রয়্যালস। যেখানে আবার আছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নস ক্রিকেটার সঞ্জু স্যামসন। আর সেই দলের বিরুদ্ধেই হলো সাকিবের অভিষেক। সেই অভিষেক ম্যাচেই সঞ্জুদের কাঁদিয়ে ২৪ রানে নিয়েছিলেন চার চারটি উইকেট নিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিহারের এই পেসার। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে আইপিএল অভিষেকে যৌথভাবে এটিই সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড।
সেদিন সাকিবের গতির চেয়েও বেশি নজর কেড়েছিল তার মাপা অফ-কাটার। পাওয়ার প্লেতে জশস্বী জয়সওয়ালের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেওয়ার পর ডেথ ওভারে তার স্লোয়ারগুলো ছিল রহস্যময়। নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন পেসার মিচেল ম্যাকক্লেনাঘান সেদিন সাকিবের বোলিং দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘সাকিবের স্লোয়ারগুলো অনেকটা মোস্তাফিজুর রহমানের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওকে মোস্তাফিজের ডানহাতি সংস্করণ মনে হচ্ছে।
সাকিবের উঠে আসার পথটা ছিল খুবই কঠিন
আজকের এই সাফল্য সাকিবের জন্য কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। ছিল খুবই কন্টকাকীর্ণ। বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার এক অতি দরিদ্র পরিবারের ছেলে সাকিব। বলা যেতে পারে চরম দারিদ্রতাই ছিল সাকিবের সঙ্গী। সাকিবের বাবা আলী আহমেদ হুসেন ছিলেন পেশায় কৃষক, কিন্তু হাঁটুর চোটের কারণে তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েন।কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দু'বেলা খাবার জোগাড় করাটাই ছিল কঠিন কাজ। তারপর আবার ছেলের ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা। সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সাকিবের বাবা বলেছেন, ‘আমার হারানোর কিছু ছিল না, যা পাওয়ার সব এখানেই। ১০-১৫ হাজার টাকা দিয়ে স্পাইক (জুতো) কিনলে ওই বেলা আমরা খাব কী? এটাই ছিল আমাদের বাস্তবতা।'
কী আর করা যাবে। ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে মা সুবুকতারা খাতুন নিজের শেষ সম্বলটুকুও বাজি রেখেছিলেন। সুবুকতারা খাতুন বলেছেন, ‘একদিন সাকিব এসে বলল, মা আমার জুতো নেই, কীভাবে ক্রিকেট খেলব? আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না, তাই নিজের গয়না বিক্রি করে ওর জন্য স্পাইক কিনে দিয়েছিলাম।’বাবা আলী আহমেদের কাছে ছেলের ক্রিকেট খেলাটা ছিল অনেকটা বাজির মতো। তিনি বলেছেন, ‘ছেলে অনেক পরিশ্রম করছিল, তাই আমরা ওর ওপর বাজি ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এটা শুধু আশা ছিল না, ছিল বাঁচার লড়াই।’
অভিষেক ম্যাচেই ১৪০ কিমি গতিতে আইপিএলে বল করেছেন সাকিব হুসেন। তবে ১৪০ কিমি গতিতে বল করেই সাকিব থামতে চান না। আত্মবিশ্বাসের সাথে সাকিব বলেছেন, "পরের মরসুমে আমি নিশ্চিতভাবে ১৫০ কিমি গতির মাইলফলক স্পর্শ করব।’
সত্যিই এ যেন রূপকথার গল্প। যে ছেলের পরিবার দু'মুঠো অন্নের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছে, সেই পরিবারের ছেলেই রাজকীয় ক্রিকেটে অংশ নিয়ে সাফল্য তুলে ধরেছে। তাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে সারা আইপিএল জুড়ে, সেই সঙ্গে বিহার জুড়ে।মায়ের সেই ত্যাগের দাম সাকিব এখন দিচ্ছেন রাজস্থান বা চেন্নাইয়ের মতো বড় দলগুলোর ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়ে।