“নাগরিকত্বের সংকটে জীবন ক্লান্ত”—এসআইআরএ তালিকা থেকে নাম বাদ, আরামবাগে ছ’জনের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন ঘিরে চাঞ্চল্য

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 h ago
“নাগরিকত্বের সংকটে জীবন ক্লান্ত”—এসআইআরএ তালিকা থেকে নাম বাদ, আরামবাগে ছ’জনের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন ঘিরে চাঞ্চল্য
“নাগরিকত্বের সংকটে জীবন ক্লান্ত”—এসআইআরএ তালিকা থেকে নাম বাদ, আরামবাগে ছ’জনের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন ঘিরে চাঞ্চল্য
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

হুগলি জেলার আরামবাগে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী থাকল প্রশাসন। এসআইআরএ তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে ছ’জন বাসিন্দা রাষ্ট্রপতির কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়েছেন। সোমবার দুপুরে তাঁরা সরাসরি আরামবাগ মহকুমা শাসকের দফতরে গিয়ে আবেদন জমা দেন। শরীরে নিজেদের যাবতীয় পরিচয়পত্র ও নথি সেঁটে তাঁরা এই প্রতিবাদ জানান, যা কার্যত প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক গভীর হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
 
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আবেদনকারীরা সকলেই আরামবাগ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। ওই ওয়ার্ডের মোট ২০৬ জনের নাম এসআইআরএ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। এই তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে, এমনকি ডিটেনশন ক্যাম্পেও পাঠানো হতে পারে।
 
স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকাও, যাঁর নাম তাইবুন্নেসা বেগম। তিনি গোঘাট ভগবতী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা হিসেবে প্রায় ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মোট ৩৪ বছর সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর স্বামীও একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, আরামবাগ গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। এত দীর্ঘ সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সুস্পষ্ট নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁর নাম বাতিল হয়ে যাওয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত।
 
মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে দাঁড়িয়ে তাইবুন্নেসা বেগম বলেন, “জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই হয়রানি আমরা সহ্য করতে পারছি না। আমাদের কাছে পেনশনের কাগজপত্র, পাসপোর্ট—সব কিছু রয়েছে। তবুও যদি আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তাহলে বেঁচে থাকার অর্থ কী?” তাঁর কথায় ধরা পড়ে গভীর অসহায়তা এবং ক্ষোভ।
 
আবেদনকারীদের দাবি, স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করেও আজ তাঁদের নতুন করে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, প্রশাসনিক ত্রুটি বা অসাবধানতার কারণে তাঁদের মতো সাধারণ মানুষ চরম বিপদের মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা স্বেচ্ছামৃত্যুকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এই ঘটনার সময় তাঁদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর স্বপন নন্দী। তিনি বলেন, “মানুষের এই অবস্থার জন্য দায়ী প্রশাসনিক গাফিলতি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, এই সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি উচ্চস্তরে বিষয়টি জানাবেন।
 
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে এবং ভোটের আগে এই ধরনের পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাঁদের দাবি, তারা সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং এই সমস্যার সমাধানেও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে।
 
প্রশাসনের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রের খবর, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যার উদাহরণ নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের প্রতিফলন।
 
নাগরিক পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা যে কতটা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, তা আরামবাগের এই ছ’জন বাসিন্দার ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে, এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় কি না।