ইরানের নজিরবিহীন হরমুজ প্রণালী পারাপার শুল্ক বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলবে

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 5 h ago
ইরানের নজিরবিহীন হরমুজ প্রণালী পারাপার শুল্ক বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলবে
ইরানের নজিরবিহীন হরমুজ প্রণালী পারাপার শুল্ক বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলবে

 
        রাজীব নারায়ণ

যুদ্ধ অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত ধারণাকে উল্টে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে মোড় নেয়। হয়তো এর কারণ, যুদ্ধ শুরু হয় নানা অনুমানের ভিত্তিতে, কিন্তু ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে থাকে অপ্রত্যাশিত ঘটনাবলীর জন্য।ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে চলতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত, যেখানে শুরুতে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ফল আসবে বলে মনে করা হচ্ছিল, সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। বরং এই সংঘাত জটিল তেল সরবরাহ সংকটের জন্ম দিয়েছে।ইসলামাবাদে অনির্ণায়ক বৈঠকের পর কূটনৈতিক আলোচনা যেমন চলছে, তেমনই বারবার থমকে যাচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—“তেল প্রবাহ আবার স্বাভাবিক করতে কী করতে হবে?”

এই যুদ্ধের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ইরানের কৌশলগত গুরুত্বের নতুন করে উত্থান, যা শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও ঘটেছে।এই নতুন সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী—একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের বিপুল অংশের তেল সরবরাহ পরিবাহিত হয়।সংঘাতের শুরুতে খুব কম মানুষই ধারণা করেছিলেন যে দ্রুত চাপে পড়বে বলে মনে করা ইরানই শেষ পর্যন্ত ‘হরমুজ প্রণালী’ নামের এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পথকে ঘিরে নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টির অবস্থানে পৌঁছে যাবে।
 
 
হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৮০,৮৮৬ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ‘জাগ লাড়কি’

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর একটি ‘টোল কর’ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে প্রণালী অতিক্রম করা প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ মার্কিন ডলার ‘শুল্ক’ ধার্য করা হবে।এই টোল আদৌ নীতিতে পরিণত হবে, নাকি কেবল কৌশলগত বার্তা হিসেবেই থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে প্রস্তাবটিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরানের কৌশলগত সংকীর্ণপথের যুক্তি

গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলের জন্য শুল্ক নেওয়ার ধারণা নতুন নয়, আবার নজিরবিহীনও নয়। সুয়েজ খাল এবং পানামা খাল তার উদাহরণ, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থানকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক বাণিজ্য সহজ করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক লাভও অর্জন করা হয়েছে।১৮৬৯ সালে নির্মিত সুয়েজ খাল ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আনে। বর্তমানে মিশর এটি একটি বড় আয়সৃষ্টিকারী সম্পদ হিসেবে পরিচালনা করে, যেখানে শুল্ক নির্ধারণ করা হয় সুসংগঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাঠামোর মাধ্যমে।

১৯১৪ সালে চালু হওয়া পানামা খাল এক শতাব্দী পরে সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে এটি জাহাজের আকার ও পণ্যবাহী সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত শুল্ক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয় এবং পানামার অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।এই খালগুলো মানবসৃষ্ট, কৃত্রিম অবকাঠামো, যা বিভিন্ন চুক্তি ও নিয়মকানুনের আওতায় পরিচালিত হয়।কিন্তু হরমুজ প্রণালী মৌলিকভাবে ভিন্ন। এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ, যেখানে সমুদ্রপথে চলাচলের অধিকার বিভিন্ন সামুদ্রিক কনভেনশন ও ট্রানজিট-সংক্রান্ত বিধানের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।এমন পরিস্থিতিতে এই পথ ব্যবহারকারীদের ওপর শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ নতুন ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে, যার পূর্ণ পরীক্ষা এখনও হয়নি।

কী প্রস্তাব করা হয়েছে?

এই মুহূর্তে এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, যার মাধ্যমে ইরান বাস্তবে এই ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারে। তবে ইরান এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে।সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রস্তাব এখনো কেবল অনুমাননির্ভর ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে; এর কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো, কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থা বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই।সেই অর্থে, প্রতি ব্যারেল তেলের ওপর প্রস্তাবিত ১ ডলারের অতিরিক্ত কর এখনই বাস্তব নীতি নয়, বরং একটি ধারণাগত ও কৌশলগত প্রস্তাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
 
তবে এটি এখন শুধু একটি ধারণা হলেও, প্রস্তাবিত এই টোল ইতিমধ্যেই ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ থেকে ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই তুলনামূলক ছোট শুল্কও যদি কার্যকর করা হয়, তাহলে তার বিরাট অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।এ ক্ষেত্রে ইরান প্রতি মাসে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার টোল আদায় করতে পারে এবং বছরে ৭০০ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার আয় করতে সক্ষম হবে।তবে এই টোল বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের ব্যবহারিক বাধাও রয়েছে। যেমন—আন্তর্জাতিক জলসীমায় এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হবে, এবং বিদ্যমান সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী এমন শুল্কের আইনি ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্ন এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ তারা শুধু নির্দিষ্ট ঘটনাতেই নয়, সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কাতেও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়।শুধু টোল আরোপের আলোচনা শুরু হওয়াতেই ইতিমধ্যেই সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তার স্তর তৈরি হয়েছে।এতটাই যে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল এ বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপের যে কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই জলপথে অবাধ ও বাধাহীন নৌচলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।যুক্তরাজ্যও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছে।

মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে

অন্যান্য দেশগুলোর কাছেও প্রস্তাবিত এই টোলের প্রভাব উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি-আমদানিকারক দেশগুলো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।পরিবহন ব্যয় যদি বাস্তবে বাড়ে, বা বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে তেলের দামে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ ভারতও এই পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ভারতের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে, ফলে সেখানে যেকোনো বিঘ্ন বা অতিরিক্ত খরচ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।প্রতি ব্যারেলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে তার বিস্তৃত সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।স্পষ্টতই, জলপথটি পুনরায় পুরোপুরি চালু করার শর্ত হিসেবে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ইরানের ইঙ্গিত বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।অনেক দেশই বলছে, “আন্তর্জাতিক আইন নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, যার অর্থ কোনো ধরনের অর্থপ্রদান বা টোল নেওয়া যায় না।”

পাটনায় এলপিজি সিলিন্ডার ভরার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে

বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে খুব শিগগিরই এই ধরনের টোল আরোপ করা হবে।আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পারস্পরিক নির্ভরশীল কাঠামো এবং জলপথ নিয়ন্ত্রণকারী আইনসমূহ পরিস্থিতিকে অনেকটাই শান্ত রাখার ভূমিকা পালন করছে।কূটনৈতিক যোগাযোগ, বহুপাক্ষিক আলোচনা এবং কৌশলগত বিবেচনাই সম্ভবত ইরানের এই টোল প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

পরিমিত পদক্ষেপ প্রয়োজন

প্রস্তাবিত টোলের চেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত বিশ্বে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের চরিত্র কীভাবে বদলে যাচ্ছে।যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে, ফলাফল খুব কমই সরলরেখায় এগোয় এবং সামরিক সক্ষমতা বা কৌশলগত দুর্বলতা নিয়ে আগের ধারণাগুলো মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে।

ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপ নিয়ে আলোচনা হলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টা। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের মোকাবিলায় নিজেদের দৃঢ় অবস্থানও তারা তুলে ধরতে চেয়েছে।অন্য দেশগুলোর কাছে এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বৈধতা এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বছরের পর বছর ধরে সুয়েজ ও পানামা খাল দেখিয়ে দিয়েছে, টেকসই টোল ব্যবস্থা তখনই সম্ভব, যখন তা স্বচ্ছতা, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং পূর্বানুমেয় শাসনব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।হরমুজ প্রণালীর ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও দেখার বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, ইরান ইতিমধ্যেই বিশ্বকে এক বড় চমক দিয়েছে।

ভারত ও বিশ্বের জন্য এর জবাব আতঙ্কে নয়, বরং প্রস্তুতিতে নিহিত। বহুমুখী জ্বালানি কৌশল, আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক শৃঙ্খলার প্রতি সমর্থনই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে।শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী আজও সেই একই জায়গা, যা সবসময় ছিল—একটি জলপথ, যার গুরুত্ব তার সংকীর্ণ জলসীমার অনেক বাইরে বিস্তৃত।কিন্তু আজ এটি শুধু তেলই বহন করছে না, বরং এক অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক সময়ের ভারও বহন করছে।

লেখক একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।