ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ধোঁয়াশায় সাধারণ মানুষ—গ্রামাঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
হাওড়া ও হুগলি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় সোমবার পান্ডুয়া ব্লক কার্যালয়ে ছুটে আসেন একাধিক বাসিন্দা। তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন, এই বিষয়ে তাঁরা সরাসরি প্রশাসনের কাছ থেকে নয়, বরং প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খবর পেয়েছেন। ফলে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে—এসব নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি।
একই চিত্র দেখা গেল উলুবেড়িয়াতেও। মহকুমা শাসকের কার্যালয়ে হাজির হন বানীবন গোহালবেড়িয়া এলাকার যুবক মুন্সী সিরাজ। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে, অথচ কীভাবে তা সংশোধন করবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। তিনি বলেন, “শুনেছি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে, কিন্তু কিভাবে করব, কোথায় ফর্ম পাব—কিছুই জানি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট নির্দেশ পাইনি।”
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং যাঁরা নিজেদের যোগ্য ভোটার বলে মনে করছেন, তাঁদের জন্য ‘এসআইআর ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এই ট্রাইব্যুনাল বসবে এবং আবেদনপত্র জমা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতদিন চলবে, আবেদন করার শেষ তারিখ কবে—এই বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি হাওড়া ও হুগলির প্রশাসনিক কর্তারা।
এই অনিশ্চয়তার জেরেই বাড়ছে মানুষের দুশ্চিন্তা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে তথ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, ফলে অনেকেই এখনও জানেন না যে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা কীভাবে তা সংশোধন করা যায়।
পান্ডুয়ার এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাষবাস করি, সারাদিন মাঠে থাকি। হঠাৎ শুনলাম আমাদের পরিবারের তিনজনের নাম নেই ভোটার তালিকায়। ব্লক অফিসে এসে জানতে পারলাম ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটা এত জটিল যে বুঝতেই পারছি না কোথা থেকে শুরু করব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উচিত আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে সচেতনতা শিবির, ক্যাম্প বা হেল্পডেস্ক চালু করা হলে সাধারণ মানুষ অনেকটাই উপকৃত হতেন। পাশাপাশি, আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ এবং স্বচ্ছ করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে পারেন।
এদিকে রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, এটি একটি নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এবং যোগ্য ব্যক্তিরা আবেদন করলেই তাঁদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করা হবে।তবে বাস্তব চিত্র বলছে, তথ্যের অভাব এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে বহু মানুষই এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, স্বল্পশিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই অবস্থায় দ্রুত এবং কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সমস্যাটি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভোটাধিকার একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার—তাই এই অধিকার থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।