করবাড়ির দুর্গাপুজোয় ২৬৯ বছর ধরে জ্বলছে সম্প্রীতির আলো! পুজোর দিনগুলোতে হিন্দু-মুসলিম সকলের অংশগ্রহণে তৈরি হয় অনন্য পরিবেশ
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 18 h ago
করবাড়ির দুর্গাপুজোয় ২৬৯ বছর ধরে জ্বলছে সম্প্রীতির আলো! পুজোর দিনগুলোতে হিন্দু-মুসলিম সকলের অংশগ্রহণে তৈরি হয় অনন্য পরিবেশ
তরুণ নন্দী / কলকাতা
২৬৯ বছরের বসিরহাটের করবাড়ির দুর্গাপুজো আজও অতীতের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ঝাড়লণ্ঠনের আলো ফিকে, তবু এই পুজোকে ঘিরে সম্প্রীতির দীপ আজও জ্বলে। অতীতের রীতি মেনে আজও বাবুঘাটের গঙ্গাজল আসে ঠাকুরদালানে। ডাকের সাজে সেজে ওঠেন দেবী। দশমীতে মায়ের মুর্তি ইছামতীর জলে বিসর্জনের আগে কাঁধে ওঠে চতুর্দোলা। আর সিঁদুর খেলায় ধর্মের বাধানিষেধ পেরিয়ে একসঙ্গে মেতে ওঠেন এলাকার হিন্দু-মুসলিম সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ। বসিরহাটের নলকড়া গ্রামের করবাড়ির দুর্গাপুজো তাই ২৬৯ বছরের পুরনো একটি পারিবারিক পুজো হলেও, এই পুজোকে ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, লোকাচার ও সম্প্রীতির এক অনন্য অধ্যায়।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের নলকড়া গ্রামের করবাড়ি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একেবারে কাছে এই বনেদী বাড়িতে যেন শরত এলেই বদলে যায় গোটা পরিবেশ। পুরনো ঠাকুরদালান যেন ফিরে পায় তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির গন্ধ। উঠোনে ব্যস্ততা বাড়ে, শিকড়ে টানে আত্মীয়রা ফিরতে শুরু করেন নিজের বাসস্থানে। সঙ্গে যোগ দেন দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ। আর সাবাইকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য হলেও সময় যেন থমকে দাঁড়ায় ২৬৯ বছরের পুরনো সেই ঐতিহ্যের সামনে।
কয়েক শতাব্দী পেরিয়েছে, সময়ের হাত ধরে অবশ্য বদলে দিয়েছে অনেক কিছুই। একদিন যে বাড়ির পুজোয় ঝলমল করত জমিদার আমলের হাজার বাতির ঝাড়লণ্ঠন, আজ সেখানে জায়গা নিয়েছে আধুনিক আলোর সাজসজ্জা। যে উঠোনে বসত যাত্রাপালার আসর, সেসব এখন ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। পুজোর ঐতিহ্য অটুট থাকলেও হারিয়ে গিয়েছে ব্রাহ্মণ ও কাঙালিভোজনের পুরনো আয়োজন। কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও করবাড়ির দুর্গাপুজোর বদলায়নি পুজোর ঐতিহ্য, মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন।
পরিবারের প্রবীণদের কথায়, রাখালদাস কর ও ঠাকুরদাস করের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে চলে আসছে সেই পুজো । সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় ওপার বাংলার বহু মানুষও আজও এই পুজোর টানে হাজির হন। তাঁদের কাছে করবাড়ির ঠাকুরদালান শুধু একটি পুজোমণ্ডপ নয়, শিকড়ের সঙ্গে যোগসূত্রেরও এক জায়গা।
২৬৯ বছরের বসিরহাটের করবাড়ির দুর্গাপুজো
করবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অভিনব রীতি। একসময় বাবুঘাটের গঙ্গা থেকে মাটির কলসিতে করে জল আনা হতো নৌকায় চাপিয়ে। সেই জল ইছামতী নদীর পথ পেরিয়ে পৌঁছত করবাড়িতে। বাড়ির পুজো সহ সারাবছরের নানা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হতো সেই গঙ্গাজল। সময় বদলেছে, তাই এখন নৌকার বদলে গাড়িতে করে বছরে একবার বাবুঘাট থেকে গঙ্গাজল নিয়ে আসা হয়। সেই জল সারা বছর পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
ঐতিহ্যের স্রোতটি কিন্তু একই রয়ে গিয়েছে। করবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক লোকবিশ্বাস। পরিবারের সদস্যদের কথা থেকে জানা যায়, একসময় স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর বাড়ির পুকুর থেকে উদ্ধার হয়েছিল একটি শিলা। পরবর্তীকালে সেটিই নারায়ণশিলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে নিত্যপুজো চলে নারায়ণশিলার।
২৬৯ বছরের বসিরহাটের করবাড়ির দুর্গাপুজো
করবাড়ির দুর্গাপ্রতিমাতেও আজও পুরনো দিনের ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। ডাকের সাজে রুপালি গহনায় সেজে ওঠেন দেবী। বংশপরম্পরায় কুমোরটুলির শিল্পীরাই এই পরিবারের প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। পুজোর সময়ে দর্শনার্থীদের জন্য প্রসাদের আয়োজন করা হয়। জাতি-ধর্মের বিভাজন এখানে চলে না। যিনি মানুষটি ঠাকুর দেখতে এসেছেন, তিনি একজন অতিথি, একজন মানুষ এই ভাবনাই যেন জায়গা করে নেয় করবাড়িতে। সিঁদুর খেলার দিন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই ছবিটা। হিন্দু-মুসলিম সহ এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে অংশ নেন। হাসি, আনন্দ আর উৎসবের রঙে মিলেমিশে যায় পরিচয়ের বিভাজন।
একই উঠোনে দাঁড়িয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সেই দৃশ্যই যেন বার্তা দেয়, উৎসবের ভাষা আলাদা নয়, আনন্দেরও কোনও ধর্ম হয় না। বছরের অন্য সময়ে প্রত্যেকের জীবন আলাদা পথে চললেও, পুজোর এই কটা দিনে তাঁদের অনেকেই এসে মিশে যান একই উৎসবের স্রোতে। বিসর্জনের রীতিতেও ছাপ রয়েছে পুরনো ঐতিহ্য। ঠাকুরদালান থেকে চতুর্দোলায় প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বারবিহার কাঁধে সেই চতুর্দোলা এগিয়ে যায় ইছামতীর দিকে। তারপর ইছামতীর জলে যেন সমাপ্তি ঘটে কয়েক দিনের এই আনন্দ উৎসব।