শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কালীঘাটের পঞ্চমুণ্ডির আসন ও তন্ত্র সাধনার মূল ভিত্তি হল 'কালীকুল'। এখানে দেবী কালীকে ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম হিসেবে পূজা করা হয়, যেখানে দেবীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। পঞ্চমুণ্ডির আসন হলো তান্ত্রিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে দেবীর এই আসনে বসে থাকা মূর্তির মাধ্যমে সমস্ত অন্ধকার শক্তির ওপর দেবীর বিজয়কে প্রতীকীভাবে দেখানো হয়।
কালীঘাট কালীকুলের অন্যতম তান্ত্রিক কেন্দ্র হিসেবে কালীঘাট মন্দিরের মাহাত্ম্য আজও সমানভাবে বিস্ময় ও শ্রদ্ধার বিষয়। এই শক্তিপীঠের অন্তরালে রয়েছে তন্ত্রসাধনার এক গভীর অধ্যায়— “পঞ্চমুণ্ডির আসন”। তন্ত্রসাধনার এই আসন কেবল আচার নয়, বরং এটি এক গভীর যৌগিক প্রক্রিয়া। কালীঘাটে দেবী কালীকে শুধু ভৈরবী বা মাতঙ্গী রূপে নয়, তন্ত্রমতে সর্বশক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে থাকা দেবীর প্রতিমা প্রতীকীভাবে অন্ধকার শক্তির ওপর আলোর বিজয় প্রকাশ করে। কালীঘাটের মন্দিরে তান্ত্রিক পুজো সাধারণত আমিষ ভোগ (পেঁয়াজ ও রসুন ছাড়া মাংস) নিবেদনের মাধ্যমে করা হয়। মায়ের ভোগে নিবেদন করা হয় দেবীর উদ্দেশ্যে বলি প্রদত্ত ছাগলের মাংস। তবে দেবীর নিত্যদিনের পুজোর ভোগে থাকে মাছের মাথা, পাঁচ রকম ভাজা, সুক্তো, ডাল, পায়েস, চাটনি , পোলাও। থাকে বিভিন্ন রকম ফলমূল। এছাড়া থাকে বাসুদেব অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ।
এই পঞ্চমুন্ডী আসনে বসে তন্ত্র-সাধনাতে অনেক বড় বড় আর কঠিন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা যায়! এই মন্দিরে দেবী কালীকে ভৈরবী, বগলা, মাতঙ্গী, বিদ্যা, কমলা ইত্যাদি বিভিন্ন রূপে পূজা করা হয়।তন্ত্রের কিছু আকরগ্রন্থ বলে পরিচিত বৃহৎ তন্ত্রসার,ভূতডামর,জ্ঞানার্নব,কূলার্নব, মুন্ডমালিকা তন্ত্র প্রভৃতি অনুযায়ী, পঞ্চমুণ্ডির আসন হল তান্ত্রিক শক্তির এক মহাশক্তিধারক মাধ্যম।
এটি তৈরি করা হয় পাঁচটি বিশেষ খুলি ব্যবহার করে— চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়াল, বেজি, বিষধর সাপ এবং হনুমানের খুলি। এই পাঁচ মুণ্ড মাটির নিচে স্থাপন করে তন্ত্রমতে তৈরি হয় সেই ভয়ঙ্কর অথচ সাধনাসিদ্ধ আসন। বিশ্বাস করা হয়, এদের প্রতিটি খুলির নিজস্ব প্রতীকী শক্তি আছে— ধূর্ততা, ক্ষিপ্রতা, জ্ঞান, নিষ্ঠা ও নির্দয়তা।
এই আসন রচনার সময়, সাধারণত ভরা অমাবস্যার নিশীথে (রাত বারোটায়) একান্ত নির্জন স্থানে— যেমন শ্মশান বা দেবস্থান— তন্ত্রসাধকরা এটি স্থাপন করেন। পঞ্চমুণ্ডি আসন তৈরি ও স্থাপন প্রক্রিয়া তীব্রভাবে গোপনীয়। প্রাচীন তন্ত্রবিশ্বাস অনুযায়ী, সামান্য আচারবিধির ত্রুটি বা স্থাপন প্রক্রিয়ায় ভুল হলে সাধকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই স্থান নির্বাচন, তিথি, নক্ষত্র ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এই সাধনা পরিচালিত হয়।
বিভিন্ন তন্ত্র সাধনার জন্য প্রস্তুত পঞ্চমুণ্ডীর আসন
কালীঘাটের পাশাপাশি তারাপীঠ, ফুল্লরা ও অট্টহাসের মতো শক্তিপীঠেও এই পঞ্চমুণ্ডির আসনের ঐতিহ্য রয়ে গেছে। বিশেষত তারাপীঠের পঞ্চমুণ্ডি আসন আজও জাগ্রত বলে সাধকসমাজের মধ্যে প্রবল বিশ্বাস রয়েছে। সাধক বামাক্ষেপা, ত্রিলোক্যনাথ স্বামী, এমনকি ঋষি বশিষ্ঠের মতো মহাসাধকরা এই আসনে বসে তন্ত্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন বলে তান্ত্রিক সাহিত্য ও লোকবিশ্বাসে উল্লিখিত।
তবে আধুনিক যুগে এই আসনকে ঘিরে রয়েছে বহু গুজব ও ভয়। অনেকের ধারণা— পঞ্চমুণ্ডির আসনের ধারে কাছে আসলেই মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু অভিজ্ঞ তান্ত্রিকদের মতে, এই ধারণা দুর্বলচিত্ত মানুষের ভয় থেকে জন্ম নিয়েছে। শক্তিশালী সাধক বা সিদ্ধ তান্ত্রিক ছাড়া এই আসনে কেউ বসতে পারে না, কারণ এর মহাশক্তি ধারণের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় মানসিক ও আধ্যাত্মিক সামর্থ্য।
তন্ত্রবিশ্বাস অনুযায়ী, পঞ্চমুণ্ডির আসন শুধু ভয়ঙ্কর নয়, বরং এটি এক শক্তিপ্রাপ্তির আসন— যেখানে সাধক দেবীর কৃপায় অলৌকিক জ্ঞান ও শক্তি লাভ করেন। তবে ভুল আচার বা অভিচার ক্রিয়া প্রয়োগ করলে সেই শক্তি ঘাত হয়ে নিজ সাধকের ওপরই প্রত্যাঘাত ঘটায়।
বর্তমানে এই আসনের স্থাপনা অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু কালীঘাট ও তারাপীঠের মতো প্রাচীন পীঠস্থানে আজও কিছু আসন সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো পূজিত ও জাগ্রত বলে বিশ্বাস করা হয়।
তান্ত্রিকদের মতে, “পঞ্চমুণ্ডির আসন” কেবল এক তান্ত্রিক উপকরণ নয়— এটি হল মানবচেতনার গভীরতম স্তরে প্রবেশের দ্বার, যেখানে ভয়, মৃত্যু ও অন্ধকার— সবকিছুকে অতিক্রম করে সাধক পৌঁছে যান জ্ঞান ও শক্তির চূড়ান্ত পরিমণ্ডলে।
কালীঘাটের মন্দির তাই আজও কেবল ধর্মীয় আস্থার স্থান নয়, বরং তন্ত্রের এক জীবন্ত কেন্দ্র— যেখানে দেবী কালী চিরকাল বিরাজমান মহাশক্তির প্রতীক রূপে।