মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
ভারতে বড়দিন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, বরং বৈচিত্র্যময় খাদ্য-পরম্পরায় সমৃদ্ধ এক সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও উদযাপিত হয়। সারা দেশ জুড়ে বড়দিনে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষরা স্থানীয় উপাদান, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক আদান–প্রদানের প্রতিফলন ঘটিয়ে বিশেষ বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে থাকেন।
পর্তুগিজ ঐতিহ্যের ছোঁয়া লাগা গোয়ার মিষ্টান্ন থেকে কেরালার সুগন্ধি মশলাদার রান্না এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক স্বাদে ভরপুর খাবার, বড়দিনের খাদ্যসংস্কৃতি যেন ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যেরই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব উপাদান ও রান্নার ধারা মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য স্বাদের জগৎ। আন্তর্জাতিক প্রভাব ও দেশজ ঐতিহ্যের এই সার্থক মেলবন্ধনই ভারতীয় বড়দিনকে বিশ্ব দরবারে এক ব্যতিক্রমী ও বর্ণময় খাদ্যউৎসবে পরিণত করেছে।
গোয়ার মিষ্টান্ন
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে বড়দিনের উদযাপন অনন্য ও স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতির মাধ্যমে চিহ্নিত হয়। এই অঞ্চলের বহু রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি এবং বড়দিনের উৎসবে খাবার একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়ের বড়দিন মানেই রান্নাঘরে শুয়োরের মাংসের বিশেষ আয়োজন। কখনও ধীরে আঁচে সেদ্ধ, কখনও আগুনে ভাজা, এই মাংসই হয়ে ওঠে উৎসবের মূল আকর্ষণ। বাঁশকোর কিংবা কালো তিলের সঙ্গে মিশে এর স্বাদ আরও গভীর হয়, যা কেবল খাবার নয়, বরং বহু প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক জীবন্ত রন্ধন-ঐতিহ্যের অংশ। কিছু পরিবার আবার গাঁজানো সরিষা, স্থানীয় ভাষায় পরিচিত ‘আখুনি’, ব্যবহার করে এই মাংস রান্না করে। তার তীব্র ও স্বতন্ত্র সুবাস বড়দিনের ভোজকে করে তোলে আরও স্মরণীয়, আর এই পদটিকে উৎসবের টেবিলে এনে দেয় এক অনন্য মর্যাদা।
আখুনি
উত্তর-পূর্ব ভারতে বড়দিনে চিকেন স্ট্যু, স্টিকি রাইস কেক এবং বাজরার মিষ্টিও বেশ প্রচলিত। এই খাবারগুলি সরল হলেও পুষ্টিকর এবং প্রকৃতি ও স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তুলে ধরে।
ভারতের অন্যতম প্রাচীন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের আবাসস্থল কেরালায় সিরিয়ান খ্রিস্টান ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া খাবারের মাধ্যমে বড়দিন অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। কেরালায় বড়দিনের সকালের শুরু প্রায়ই আপ্পাম ও স্ট্যু দিয়ে হয়। আপ্পাম হলো নরম ও হালকা চালের প্যানকেক, যা নারকেল, সবজি এবং মুরগি বা খাসির মাংস দিয়ে তৈরি মৃদু ও ক্রিমি স্ট্যুর সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। হালকা হলেও এই খাবারটি অসাধারণ স্বাদে ভরপুর এবং বড়দিনের প্রাতরাশে বিশেষ স্থান পায়।
আঠালো চালের মিষ্টি
কেরালায় বড়দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো রোস্টেড হাঁস বা রিয়াস্টেড মুরগি। কালো গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারচিনি ও পেঁয়াজ দিয়ে মাংস মেরিনেট করে ধীরে ধীরে আগুনে রোস্ট করা হয়। গভীর স্বাদ ও উষ্ণ সুগন্ধের জন্য এই রোস্টগুলি বিশেষভাবে পরিচিত। পাশাপাশি কেরালার বড়দিন প্লাম কেক ছাড়া অসম্পূর্ণ। এটি পাশ্চাত্যের ফলের কেকের মতো নয়; কেরালার প্লাম কেক ক্যারামেলাইজড চিনি, শুকনো ফল এবং অনেক সময় অল্প পরিমাণ রাম দিয়ে তৈরি করা হয়।
গোয়ার বড়দিনের খাবার স্থানীয় কঙ্কণি উপাদান ও রান্নার শৈলীর সঙ্গে পর্তুগিজ শাসনকালের দীর্ঘ ইতিহাসকে তুলে ধরে। গোয়ায় উৎসবের মরশুম মানেই খাবার ও আনন্দের মিলিত উদযাপন।
ভিন্ডালু
গোয়ার বড়দিনের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার হলো বেবিঙ্কা। ‘গোয়ার মিষ্টির রানি’ নামে পরিচিত এই ত্রিস্তরীয় পুডিংটি নারকেল, ডিম, চিনি বা গুড় ও ঘি দিয়ে তৈরি হয়। প্রতিটি স্তর ধীরে ধীরে আলাদা করে বেক করা হয়, ফলে এটি শ্রমসাধ্য হলেও অত্যন্ত মূল্যবান একটি মিষ্টান্ন।
গোয়ার বড়দিনের খাদ্যতালিকায় মাংসের পদও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘শুয়োরের মাংস সরপোটেল’ ও ‘ভিন্ডালু’ বিশেষভাবে জনপ্রিয়। সরপোটেল হলো মশলাদার ধীরে রান্না করা শুয়োরের মাংস, আর ভিন্ডালু তার ঝাল-টক স্বাদের জন্য পরিচিত। এই পদগুলি প্রায়ই বড়দিনের কয়েকদিন আগেই রান্না করা হয় যাতে স্বাদ আরও গভীর হয়।
এগনগ
গোয়ার বাড়িগুলি বড়দিনে নিউরিওস ও কুলকুলের মতো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিতে ভরে ওঠে। নিউরিওস হলো নারকেল ও গুড় ভর্তি মিষ্টি ডাম্পলিং এবং কুলকুল হলো চিনির প্রলেপ দেওয়া ছোট ভাজা মিষ্টি। ‘কুচোয়ার’-এর অংশ হিসেবে পরিবারগুলি এই মিষ্টিগুলি একসঙ্গে তৈরি করে এবং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়।
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে বড়দিনের খাবার সরলতা ও উষ্ণতার প্রতীক। রোজ কুকিজ বা আচাপ্পাম বড়দিনের অত্যন্ত জনপ্রিয় জলখাবার। চালের গুঁড়ো, নারকেল ও চিনি দিয়ে তৈরি এই ফুলের আকৃতির কুকিজ উৎসবের মিষ্টতার প্রতীক।
আচাপ্পাম
এই রাজ্যগুলিতে বহু খ্রিস্টান পরিবার বড়দিনে মাটন বিরিয়ানি রান্না করে। গোটা মশলার সুবাসে ভরপুর এই বিরিয়ানি সাধারণত রাইতা বা মাংসের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। পাশাপাশি কেশরী, পায়েস ও হালুয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় মিষ্টিও বড়দিনের টেবিলে জায়গা করে নেয়।
মুম্বাইয়ে পূর্ব ভারতীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিজস্ব বড়দিনের খাদ্যপরম্পরা রয়েছে। ২০ থেকে ২৫ বার রোদে শুকোনো বিশেষ মশলার মিশ্রণ দিয়ে রোস্ট মাংস তৈরি করা হয়, যা খাবারকে গভীর ও স্বতন্ত্র স্বাদ দেয়।
বেবিঙ্কা
বড়দিনের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হলো ফুগিয়া, নরম ও ফুলে ওঠা ভাজা রুটি, যা সুগন্ধি তরকারির সঙ্গে খাওয়া হয়। বাংলা ও পূর্ব ভারতীয় খ্রিস্টান পরিবারগুলি ভারতীয় উৎসবের রীতির সঙ্গে খ্রিস্টীয় প্রতীক মিলিয়ে জবা ফুল বা কিশমিশ দিয়ে তৈরি ঘরোয়া মদ, কুলকুল, রোজ কুকিজ, নারকেল লাড্ডু ও খেজুরের রোল তৈরি করে থাকেন।
পূর্ব ভারতে বড়দিনের খাবারের তালিকায় রয়েছে অসাধারণ বৈচিত্র্য। কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার এবং ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার খ্রিস্টান সম্প্রদায় ঐতিহ্য ও স্থানীয় খাবারের মেলবন্ধন ঘটান। কান্ট্রি চিকেন কারি, প্রন কাটলেট, ঘরে তৈরি কেক এবং রাম ভেজানো ফলের কেক বড়দিনের প্রধান আকর্ষণ। এই খাবারগুলি পরিবারকে একসূত্রে বাঁধে এবং পুরোনো ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে।
কুলকুল
ভারতীয় বড়দিনের খাবার শুধু স্বাদের বৈচিত্র্যেই বিশেষ নয়, প্রতিটি পদে লুকিয়ে থাকে আবেগ ও গল্প। প্রতিটি রান্নার পদ্ধতি বহন করে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সামাজিক বন্ধনের ইতিহাস। কেরালার মশলাদার রোস্ট থেকে গোয়ার মিষ্টান্ন কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের আগুনে পোড়া খাবার, সবই বৈচিত্র্যের উৎসবকে উদযাপন করে এবং দেখায় যে বিভিন্ন সংস্কৃতি একত্র হলে উৎসব কতটা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
আজ পশ্চিমা বিশ্বে বড়দিনের প্রতীক হয়ে ওঠা রোস্টেড টার্কি শুরুতে এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীর আগে ইউরোপীয় বড়দিনে হাঁস, মুরগি ও শুয়োরের মাংসই বেশি দেখা যেত। আমেরিকা আবিষ্কারের পর টার্কি বড়দিনের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হয়। এই পাখিটি বর্তমান মেক্সিকোর স্থানীয়।
বড়দিনে টার্কি পরিবেশন করা প্রথম ইংরেজ রাজাদের একজন হিসেবে রাজা অষ্টম হেনরির নাম উল্লেখ করা হয়। এর জনপ্রিয়তার কারণ স্বাদ নয়, বরং বিশাল আকার। ভিক্টোরিয়ান যুগে টার্কি সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠে এবং চার্লস ডিকেন্স এটিকে বড়দিনের উৎসবের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
বড়দিনের আরেকটি ভুল বোঝা খাবার হলো প্লাম পুডিং, যেখানে আদতে কোনো প্লামই থাকে না। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে ‘প্লাম’ বলতে শুকনো ফল, বিশেষত কিশমিশ বোঝানো হতো। শস্য ও দুধ দিয়ে তৈরি এই পুডিং উপবাসের সময় খাওয়া হতো।
রোস্টেড টার্কি
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এতে শুকনো ফল, জায়ফল, দারচিনি ও সুরা যোগ করে একে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, সপ্তদশ শতকে পিউরিটানরা এটিকে বিলাসিতা বলে নিষিদ্ধ করেছিল। আজ সেই একসময়ের নিষিদ্ধ ডেজার্টই ব্রিটিশ বড়দিনের গর্ব।
জিঞ্জারব্রেডও বড়দিনের জনপ্রিয় খাবার। এর শুরু ছিল ঔষধি খাদ্য হিসেবে, যেখানে আদার হজমক্ষমতা কাজে লাগানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি গির্জার উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়। রানী এলিজাবেথ প্রথম জিঞ্জারব্রেড কুকিজ উপহার দিয়ে একে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরে জার্মান বেকারদের তৈরি জিঞ্জারব্রেড হাউস ‘হ্যান্সেল ও গ্রেটেল’ গল্পে অমর হয়ে যায়।
জবা ফুল ও কিশমিশ দিয়ে তৈরি সুরা
রানি এলিজাবেথ প্রথম জিঞ্জার ব্রেড কুকিজ উপহার দিয়ে এই খাবারটিকে রাজদরবার থেকে সাধারণ মানুষের উৎসবে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। পরে অষ্টাদশ শতকে এক জার্মান বেকার জিঞ্জার ব্রেড দিয়ে তৈরি করেন ছোট ছোট ঘরের আদলে মিষ্টান্ন, যা পরবর্তীতে ব্রাদার্স গ্রিমের অমর রূপকথা ‘হ্যান্সেল অ্যান্ড গ্রেটেল’–এর মাধ্যমে লোককথার জগতে স্থায়ী আসন পায়। সময়ের প্রবাহে জিঞ্জার ব্রেড আজ বড়দিনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, যে খাবার একসময় ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকজ কল্পনার গভীর প্রতীক বহন করত।
বড়দিনের উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্যতম অভিজাত পানীয় হলো এগনগ। এর উৎপত্তি মধ্যযুগীয় ব্রিটিশ পানীয় ‘পসেট’ থেকে, যেখানে গরম দুধের সঙ্গে এল বা ওয়াইন মিশিয়ে পান করা হতো। ডিম, দুধ ও আমদানিকৃত মশলার উচ্চমূল্যের কারণে একসময় এগনগ ছিল কেবল বিত্তশালীদের পানীয়, যা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হতো।
ফ্রুট কেক
এই পানীয়টি যখন ঔপনিবেশিক আমেরিকায় পৌঁছায়, তখন দামি মদের বদলে তুলনামূলক সস্তা রাম ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর ফলে এগনগ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পানীয় পরিবেশন করা উদারতা ও আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়েছে, যে মূল্যবোধ আজও বড়দিনের উদযাপনে অটুট রয়েছে।
বড়দিনের খাবার হয়তো দেখতে চিরকালীন, কিন্তু প্রতিটি পদ নিজের মধ্যে বহন করে অভিবাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, বিশ্বাস আর মানুষের সৃজনশীলতার দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ ভোজের টেবিলে স্থান পাওয়া মেক্সিকোর টার্কি থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক স্মৃতিতে গাঁথা কেরালার কেক, বড়দিনের প্রতিটি থালাই যেন সময় ও সংস্কৃতির এক নীরব গল্প বলে চলে।