কলকাতা ঃ
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন পূর্ণমাত্রার সাংবিধানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পরও মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল টিএন রবি সংবিধানের ১৭৪(২)(বি) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে কার্যত অবসান ঘটেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা ১৫ বছরের শাসনের।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) লোকভবন ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সপ্তদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ৭ মে থেকেই বিলুপ্ত হিসেবে গণ্য হবে। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন রাজ্যের মুখ্যসচিব দুশ্যন্ত নারিয়ালা।এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, বিধানসভা বিলুপ্ত হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের ফল তিনি মানেন না এবং “চুরি হওয়া” নির্বাচনের ভিত্তিতে তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মমতা বলেছিলেন, “আমি পদত্যাগ করছি না। আমরা হারিনি। ভোট লুট করা হয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং বিজেপি একযোগে পরিকল্পিতভাবে ভোটের ফল প্রভাবিত করেছে।নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজ আসন ভবানীপুর থেকেও পরাজিত হয়েছেন।তবে ফল ঘোষণার পর থেকেই মমতা অভিযোগ করে আসছেন, এটি “গণতন্ত্রের হত্যা” এবং “কালো নির্বাচন”। তিনি ভোটে অনিয়ম তদন্তে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের ঘোষণাও দিয়েছেন।
এদিকে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন। কারণ, সাধারণত কোনো মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে হারলে রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তদারকি বা কেয়ারটেকার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মমতা।ভারতের সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হলে সরকারের সাংবিধানিক বৈধতাও শেষ হয়ে যায়। ফলে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যত মন্ত্রিসভার অস্তিত্বও বিলুপ্ত হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর মন্ত্রিসভা এখন “প্রাক্তন” সরকার হিসেবে বিবেচিত। যদিও রাজ্যপাল আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে বরখাস্ত করেননি।বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বিধানসভা ও মন্ত্রিসভা না থাকায় এখন রাজ্যের সাংবিধানিক ক্ষমতা সরাসরি রাজ্যপালের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। কারণ, রাজ্য সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত রাজ্যপালের নামেই পরিচালিত হয় এবং মন্ত্রিসভা সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। এখন সেই প্রতিনিধিত্বকারী সরকার না থাকায় রাজ্যপাল নিজেই সরাসরি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারেন।যদিও অনেকের মতে, চাইলে রাজ্যপাল কেন্দ্রের অনুমোদন নিয়ে দেড় দিনের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসনও জারি করতে পারতেন। তবে এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি।রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার বিজেপিকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাতে পারেন রাজ্যপাল টিএন রবি। বিজেপির বিধায়করা তাঁদের সমর্থনের চিঠি রাজ্যপালের কাছে জমা দেবেন। এরপর শনিবার নতুন সরকারকে শপথ পড়ানো হতে পারে।
বিজেপির পক্ষ থেকেও ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিন ৯ মে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে।এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এখনো দাবি করছে, তারা “নৈতিকভাবে পরাজিত হয়নি” এবং নির্বাচনী কারচুপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।