জেব আখতার
ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব, যেখানে মহিলাদের জীবন সীমিত ছিল ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে, এবং শিক্ষার বা স্বাধীনতার কোনো ধারণাই ছিল না। এমন সময়ে একজন নারী আবির্ভূত হয়েছিলেন, যিনি পরিস্থিতির সঙ্গে আপোস করেননি, বরং তা পরিবর্তন করেছেন।
তিনি ছিলেন খাদিজা বিন্ট খুয়াইলিদ। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি কেবল তাঁর ব্যবসা সামলাননি, বরং মক্কায় সবচেয়ে সম্মানিত ব্যবসায়ী নারী হয়ে উঠলেন। একই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি নবী মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন।
এক সমাজে যেখানে মহিলাদের কণ্ঠ প্রায়শই দমন করা হতো, খাদিজা কেবল কণ্ঠ তুলেছেন না, বরং সম্মান অর্জন করেছেন এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তার গল্প প্রমাণ করে যে প্রকৃত উদ্যোক্তা হওয়া মানে কেবল ব্যবসা গড়ে তোলা নয়, বরং নিজের পরিস্থিতি ও মানসিকতার বাধাগুলো ভাঙার সাহস রাখাও।
এছাড়া, খাদিজা বিন্ট খুয়াইলিদের জীবন কেবল শক্তির উৎস নয়, এটি ভারতের মুসলিম নারীদের জন্য আজকের সময়েও একটি শিক্ষণীয় পাঠ। আসুন বুঝি কিভাবে।
আত্মনির্ভরতার এক উদাহরণ
খাদিজা তাঁর পিতা খুয়াইলিদের মৃত্যুর পর পারিবারিক ব্যবসা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর উটের কারাভান মক্কা থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন এবং বাসরায় ভ্রমণ করত, এবং মসলা, বস্ত্র, সুগন্ধি ও শস্যে ব্যবসা করত। তাঁর এজেন্টদের মধ্যে তিনি সততা এবং দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিলেন। ইতিহাসবিদ ইবনে সা়দ লিখেছেন, “যদি মক্কার বাজারে কোনো নাম নিশ্চয়তার প্রতীক হত, তা ছিল খাদিজার।”
ভারতের প্রেক্ষাপটে, খাদিজা বিন্ট খুয়াইলিদ আজও মুসলিম নারীদের জন্য শক্তি ও প্রেরণার প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছেন। তার গল্প প্রমাণ করে যে আত্মনির্ভরতা কোনো আধুনিক ধারণা নয়, বরং এটি আমাদের ঐতিহ্যের গভীরে নিহিত।
আজ যখন কেরালার নাজরিন বানু মসলা রপ্তানিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন, বা আলিগড়ের শাহিন মুনাওয়ার ইকরা ডিজাইনস এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, তারা সেই একই ঐতিহ্যের প্রতিফলন, যা শতাব্দী আগে মক্কার রাস্তায় শুরু হয়েছিল।
খাদিজাকে তাঁর সময়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হত। তিনি কখনও প্রতারণা বা ভণ্ডামিতে ভরসা রাখতেন না। তাঁর দর্শন স্পষ্ট ছিল: “আপনার লেনদেনে সত্যনিষ্ঠ থাকুন, এবং আশীর্বাদ আপনার দিকে আসবে।”
এই একই সততা যুবক মুহাম্মদকে আকৃষ্ট করেছিল, যিনি তাঁর সৎ চরিত্র এবং নৈতিকতার জন্যও পরিচিত ছিলেন।
সততা ও নৈতিকতার গুণগুলোই ভারতের মুসলিম উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়কে চিহ্নিত করে, যেমন হায়দ্রাবাদের রুখসানা হাবিব, যিনি একটি অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছিলেন—“ট্রু ট্রেডার্স”, যেখানে তিনি তাঁর ব্র্যান্ড নীতি হিসেবে অনুসরণ করেন “ট্রেন্ডের চেয়ে বিশ্বাস”।
একইভাবে, লখনউয়ের হিনা আহমেদের বেকারি ব্র্যান্ড “হিনার হোম বাইটস” শুধুমাত্র স্বাদের প্রতীক নয়, বরং বিশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে—কারণ তিনি প্রতিটি গ্রাহকের জন্য স্বচ্ছতা ও পবিত্রতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এই গল্পগুলো একই শিক্ষা দেয় যা খাদিজা শেখিয়েছিলেন—“খ্যাতি হলো প্রকৃত মূলধন।”
খাদিজার দূরদর্শিতার সবচেয়ে অসাধারণ উদাহরণ ছিল যুবক মুহাম্মদকে তাঁর বাণিজ্যিক কারাভানের নেতা নিযুক্ত করা। এটি শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ। তিনি দক্ষতাকে ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়। এবং এই অংশীদারিত্ব পরবর্তীতে একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের জন্ম দেয় যা সমগ্র বিশ্বের গতিপথ পরিবর্তন করে।
এবং আশ্চর্যের কিছু নেই যে ভারতের সমসাময়িক কিছু নারীও এই একই ভিশনকে বাস্তবায়ন করছেন। যেমন কেরালার মিনহা রাশিদ, যিনি একটি সমবায় উদ্যোগ শুরু করেছেন—“থ্রেডস অফ হোপ”, যেখানে ২০০-এর বেশি স্থানীয় নারী হস্তশিল্প তৈরি করে আত্মনির্ভরতা অর্জন করছেন।মিনহা বলেন, “লাভের চেয়ে বেশি, আমরা আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলছি।” খাদিজাও একই ভিশন শেয়ার করেছিলেন: সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে অন্যদের উন্নতি করা।
খাদিজা তাঁর লাভের একটি বড় অংশ দরিদ্র, অনাথ ও বিধবা মহিলাদের সাহায্যে বিনিয়োগ করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি কঠিন সময়ে মক্কার শত শত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন। এবং যখন নবী সমাজিক বয়কটের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ সেই সংগ্রামে বিনিয়োগ করেছিলেন। আজকের “সামাজিক উদ্যোক্তা” ধারণা এই চিন্তাধারার আধুনিক প্রকাশ।
দিল্লির সানা খান একটি উদ্যোগ শুরু করেছিলেন—“মাদার্স বাস্কেট”, যেখানে গ্রামীণ নারীরা জৈবিক খাদ্য উৎপাদন করেন এবং লাভের একটি অংশ শিশুদের শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা হয়। এটি একই দর্শন—লাভের সঙ্গে উদ্দেশ্য (Profit with Purpose)।
সংগ্রাম, সঙ্গতি এবং ধৈর্য
খাদিজার জীবন সংগ্রামে ভরা ছিল—স্বামীর মৃত্যু, ব্যবসার দায়িত্ব, সামাজিক সমালোচনা, এবং প্রাথমিক ইসলামের সময় অর্থনৈতিক বর্জনের মতো চ্যালেঞ্জ।
তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। তিনি তাঁর বাড়িকে সহায়তার কেন্দ্র বানিয়েছিলেন, নবীর মনোবল বাড়িয়েছিলেন, এবং তাঁর অর্থনৈতিক জ্ঞান দিয়ে নতুন সমাজের ভিত্তি শক্তিশালী করেছিলেন।
আজকের ভারতের মুসলিম নারীরাও একই মনোভাব প্রদর্শন করছেন, যখন তারা কাজ, পরিবার এবং সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে সঙ্গতি বজায় রাখেন। সত্যিই, একজন নারীর প্রকৃত শক্তি তার ধৈর্য এবং দিকনির্দেশনায় নিহিত।
খাদিজা আল-কুব্রা ছিলেন ইসলামে বিশ্বাস করা প্রথম নারী, কিন্তু তার চেয়েও বেশি, তিনি বিশ্বে প্রথম প্রমাণিত ব্যবসায়ী নারী হিসেবে বিবেচিত। তাঁর অনুপ্রেরণা সীমাবদ্ধ নয়—না দেশ দ্বারা, না ধর্ম দ্বারা—বরং এটি মানবতা এবং আত্মনির্ভরতার একটি উদাহরণ।
আজকের দিনে, ভারতের মুসলিম নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের ছাপ রেখে যাচ্ছেন, পোশাক থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত। উদাহরণস্বরূপ, মুম্বাইয়ের ফাতিমা বানো, যিনি “TechForHer” এর মাধ্যমে নারীদের কোডিং শেখাচ্ছেন, অথবা জোধানপুরের আফরিন শেখ, যিনি বায়োফুয়েল উৎপাদনে একটি স্টার্টআপ পরিচালনা করছেন। খাদিজার উত্তরাধিকার তাদের সব গল্পে বেঁচে আছে। তাদের জীবন আমাদের শেখায়, “বিশ্বাস এবং নৈতিকতার সঙ্গে অর্জিত সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য।”
পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে খাদিজা:
“যখন নবী মুহাম্মদ তাঁর ব্যবসায়িক লেনদেনে সততা প্রদর্শন করতেন, তখন খাদিজা তাঁর লেনদেনের দায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করতে শুরু করেন।” – ইবনে হিশাম
“খাদিজা মক্কায় কয়েকজন মহিলার মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি কেবল মূলধনের মালিকই ছিলেন না, বরং প্রতিটি অংশীদারিতে তার স্বীকৃতি ছিল। তাঁর প্রতিটি লেনদেন বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হত।” – ইবনে ইশাক
“মক্কা ত্যাগ করা কারাভানের অর্ধেকের নাম ছিল খাদিজা। তাদের বাণিজ্য সিরিয়া, ইয়েমেন এবং মিশরে বিস্তৃত ছিল।” – আল-তাবারি
“খাদিজা তাঁর কর্মচারীদের ন্যায় এবং সহানুভূতির সঙ্গে আচরণ করতেন। তিনি লাভকে অন্যদের সাহায্যের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।” – আল-মাকরিজি
“খাদিজার ব্যবসায়িক দর্শন এতটা স্পষ্ট ছিল যে আজকের ব্যবসায়িক মডেলও তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।” – মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ
“খাদিজার সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার হলো যে তিনি ব্যবসায় নৈতিকতাকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছে, সাফল্য মানেই বিশ্বাস এবং দায়িত্ব।” –ডঃ তারিক রামাদান