পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভে রক্তপাত: নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আন্দোলন, নিহত অন্তত ১১

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 9 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
মুজাফ্ফরাবাদ:

 পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি ঘিরে চলা বিক্ষোভ নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)-র সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৭০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী ৯ জুন ডাকা অঞ্চলজুড়ে বন্‌ধের আগে রাওয়ালাকোটে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত দুই বছর ধরে মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে জেএএসি। সম্প্রতি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এরপরই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আগের এক গুলির ঘটনায় নিহত এক আন্দোলনকারীর মরদেহ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে জড়ো হন জেএএসি-র সমর্থকরা। নিরাপত্তা বাহিনী ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।পুঞ্চ বিভাগের কমিশনার সরদার ওয়াহিদ খান দাবি করেছেন, "দুষ্কৃতীদের গুলিতে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।" তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টা অভিযানে ছয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হন।

অন্যদিকে, পুলিশ প্রধান লিয়াকত মালিক জানান, সংঘর্ষে ২৩ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। অভিযানের সময় একাধিক ব্যক্তিকে আটকও করা হয়েছে।তবে সরকারি এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেএএসি সমর্থক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, প্রকৃত বেসামরিক নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হলো ৪৫ সদস্যের আইনসভায় পাকিস্তানের অন্যত্র বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত। জেএএসি নেতাদের অভিযোগ, এর ফলে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং অবিলম্বে এই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে।

শুধু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নয়, জেএএসি দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বিদ্যুৎ সংকট এবং অঞ্চলটির রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের বিরুদ্ধেও আন্দোলন চালিয়ে আসছে। গত দুই বছরে বিদ্যুতের বিল ও আটার মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সংগঠনটি একাধিক বৃহৎ বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করে, যার অনেকগুলোই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে শেষ হয়।৯ জুনের বন্‌ধ কর্মসূচি শুধু সংরক্ষিত আসনের বিরোধিতার জন্য নয়; সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ এবং জেএএসি-র এক নেতার হত্যার প্রতিবাদেও ডাকা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন (এইচআরসিপি) এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কমিশন প্রশাসনের প্রতি সংযম প্রদর্শন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সংলাপের মাধ্যমে জনঅসন্তোষের সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি তথ্য-অনুসন্ধানী দল পাঠানোর কথাও জানিয়েছে তারা।

অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জেএএসি নেতারা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও বার্তায় সংগঠনের নেতা শওকত নওয়াজ মীর বলেন,"রাওয়ালাকোটে রাষ্ট্র আমাদের মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু করেছে।"

আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জনসমাবেশের ওপরও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং জেএএসি-র কেন্দ্রীয় কার্যালয় সিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

পরিস্থিতির অবনতিতে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, এলাকায় সড়ক অবরোধ, যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন এবং চলাচলে বিধিনিষেধের আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি অন্যতম গুরুতর সহিংসতার ঘটনা। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ তারই প্রতিফলন।