সুদীপ শর্মা চৌধুরী,গুয়াহাটি:
শিশুর মুখে হাসি—এই স্বপ্ন নিয়েই আজ সারাদেশে পালিত হচ্ছে শিশু দিবস। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর জন্মদিনকে স্মরণে রেখে প্রতিবছর দিনটি উদযাপন করেন কোটি কোটি ভারতবাসী। চাচা নেহরু শিশুদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং তাদের শিক্ষার, স্বাস্থ্যের ও আনন্দের অধিকারের কথা বারবার বলেছেন।
এই বছরের শিশু দিবসের মূল প্রতিপাদ্য—“For Every Child, Every Right”, অর্থাৎ “প্রতিটি শিশুর জন্য প্রতিটি অধিকার।”
দেশজুড়ে আজ এই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—প্রতিটি শিশুর জীবনে সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভালোবাসা পৌঁছে যাক সমানভাবে।
শিশু দিবস শুধু আনন্দের দিন নয়, এটি এক অঙ্গীকারের দিন। দেশের ভবিষ্যৎ যাদের হাতে, সেই শিশুদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার দিন এটি।বিশেষজ্ঞদের মতে, “দেশের ভবিষ্যৎ এই শিশুদের হাতে। তাদের প্রত্যেকের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের জরুরি দায়িত্ব।”
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে বেঁচে থাকার, বেড়ে ওঠার, শেখার, ও নিরাপদ পরিবেশে থাকার। এই দিনটি সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—শিশু উন্নয়নের মূল ভিত্তি
একটি শিশুর জীবন গড়ে ওঠে তার শিক্ষার ভিতের ওপর। তাই মানসম্মত ও বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।ভারতের জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP 2020) প্রারম্ভিক শৈশবের যত্ন ও শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।অন্যদিকে, স্বাস্থ্যও শিশু বিকাশের অন্যতম স্তম্ভ।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও মালপুষ্টি, শিশু মৃত্যু ও টিকাকরণে ঘাটতি দেখা যায়। এই সমস্যা দূর করতে সরকার চালাচ্ছে পোষণ অভিযান, মিড-ডে মিল, আঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র প্রভৃতি প্রকল্প।
তবে সচেতন সমাজ ছাড়া এই প্রকল্পগুলির সাফল্য সম্ভব নয়—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।অধিকার শুধু কাগজে নয়, বাস্তবায়নে দরকার অঙ্গীকার । শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় একাধিক আইন রয়েছে—Right to Education Act, Juvenile Justice Act, এবং POCSO Act। তবুও বাস্তবে বহু শিশু আজও স্কুলছাড়া, শ্রমে নিযুক্ত বা নির্যাতনের শিকার। আইন থাকলেও প্রয়োগে ঘাটতি আজও প্রকট। তাই সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে—শিশুর অধিকার যেন শুধু নীতিপত্রে নয়, জীবনের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়।
আজ দেশজুড়ে স্কুল, কলেজ ও নানা সংস্থা শিশু দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি করেছে।চিত্রাঙ্কন, ক্রীড়া, নাট্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভায় মুখর শিক্ষাঙ্গন।অনেক সংস্থা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে শিক্ষাসামগ্রী, পোশাক ও খাবার তুলে দিয়েছে।UNICEF, Save the Children, ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলিও আজ নানা উদ্যোগে শিশু অধিকার ও সুরক্ষার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
শিশুর প্রথম পাঠশালা তার পরিবার। সেখানে সে শেখে ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার পাঠ।তাই অভিভাবকদের দায়িত্ব, সন্তানকে শুধুমাত্র পড়াশোনার চাপ না দিয়ে তার মানসিক বিকাশ ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি করা।সমাজকেও হতে হবে সচেতন—বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হতে হবে।
মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতার গুরুত্ব ।শিক্ষা ও পুষ্টির পাশাপাশি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, একঘেয়ে রুটিন ও সামাজিক চাপ শিশুদের মনে ভয় ও হতাশা তৈরি করে।তাই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সঙ্গীত, নাচ, চিত্রাঙ্কন—এসব সৃজনশীল মাধ্যমে শিশুদের আনন্দ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে।
ডিজিটাল যুগে শিশুর সুরক্ষা
আজকের শিশুরা বড় হচ্ছে ডিজিটাল পরিসরে। ইন্টারনেট যেমন জ্ঞানের উৎস, তেমনি বিপদেরও কারণ হতে পারে।
সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে শিশুদের রক্ষা করা এখন জরুরি।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন থাকতে হবে এবং সরকারকেও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষাদান বাড়াতে হবে।ভবিষ্যতের ভারত শিশুদের হাতেই ।একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিশুদের বিকাশের ওপর।
তাদের প্রতিটি স্বপ্নই দেশের নতুন সম্ভাবনা। তাই শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করাই আজকের সময়ের দাবি।
শিশু দিবসের এই দিনে প্রতিজ্ঞা একটাই—প্রতিটি শিশুর জন্য প্রতিটি অধিকার”—এই হোক ভারতের চূড়ান্ত অঙ্গীকার।“শিশুর মুখে হাসি মানে দেশের ভবিষ্যতের হাসি।” — পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু।আজকের শিশু, আগামীর নাগরিক।তাদের জন্য নিরাপদ, স্নেহপূর্ণ ও শিক্ষামুখর পরিবেশ তৈরি করা শুধু সরকারের কাজ নয়—এটি আমাদের সকলের দায়িত্ব।
চলুন, শিশু দিবসের এই দিনে প্রতিজ্ঞা করি—প্রতিটি শিশুর হাসি রক্ষা করব, তাদের অধিকার নিশ্চিত করব।